• Estuary of Teesta and Rangit Rivers

  • Teesta View Point

  • Chatakpur, Darjeeling

  • Chilapata Forest

Wednesday, August 26, 2020

সিটং কার্সিয়ং দার্জিলিং - Sittong, Kurseong, Darjeeling

 কমলালেবুর গ্রাম সিটং। শীতে কমলালেবুর মরশুমে যখন কমলালেবু হয়, গোটা গ্রামটি যেন কমলা রং ধারণ করে। পাহাড়ী পথের আঁকে-বাঁকে যারা পাঁয়ে হেঁটে ঘুরতে ভালোবাসেন তাদের জন্য অসাধারণ একটি গন্তব্য হতে পারে সিটং।

রিয়াং নদীর ধারে বসে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা উপলব্ধি করতে করতে আপনি হারিয়ে যেতে পারেন মনের কোনো অজানা আস্তানায়। পথের ধারে কমলালেবুর বাগান আর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া রিয়াং নদীর সাথে পা মিলিয়ে আপনি চলতেই পারেন কোন নাম না জানা পথে।

সিটং এ করার তেমন কিছু নেই, প্রকৃতিকে উপভোগ করা ছাড়া। তবে নেচার ওয়াক, বার্ডিং, ফিসিং এবং জনকোলাহল থেকে লুকিয়ে প্রকৃতির খুব কাছে থাকা যায় সিটং এ। এছাড়া যারা পাখি ভালোবাসেন তাদের জন্য এক দারুণ আস্তানা এই সিটং। সিটং এ দেখা পেয়ে যাবেন হর্ণবিল বা ধনেশ পাখির।


সিটং লাটপাঞ্চার এইসব অঞ্চলে এদের অবাধ বিচরণ ক্ষেত্র। আর আপনি যদি কমলালেবু ভালোবাসেন তবে যত খুশি কমলালেবু খেতে পারেন। হিমালয়ান পাখি এবং বিভিন্ন প্রজাতির প্রজাপতির দেখা মিলবে সিটং এ। শহুরে কোলাহল থেকে দূরে সিটং এ ভালোই লাগবে।

দর্শনীয় স্থান: মাত্র ২০ কিমি দূরেই মংপুতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাড়ী ঘুরে আসতে পারেন। এছাড়া লাটপাঞ্চার, অহলডারা, নামথিং পোখরি লেক, শেল্ফু হিলস ও ঘুরে আসুন গাড়ী ভাড়া করে। নামথিং পোখরি লেকে দেখা মিলবে পৃথিবীর প্রাচীন জীবগুলির মধ্যে অন্যতম স্যালামেন্ডারের। দিলারাম, বাগোরা, চটকপুরের মতো গ্রাম গুলিও কাছেই। চাইলেই ঘুরে আসতে পারেন।

সিটং এ কমলালেবু দেখার সেরা সময় নভেম্বর থেকে জানুয়ারী। গাছে গাছে কমলালেবু গোটা গ্রামটাকেই কমলা করে রাখে। মাত্র ৪০০০ ফুট উচ্চতায় হওয়ায় ঠান্ডার তীব্রতাও খুব বেশি নয়।

নিউ জলপাইগুড়ি থেকে
লাটপাঞ্চার হয়ে গেলে দূরত্ব ৫৫ কিমি।
মংপু হয়ে গেলে দূরত্ব ৭৫ কিমি।
গাড়ী ভাড়া ৩০০০/- টাকা।
হোমস্টেতে খরচ-
*রুম ডল শেয়ারিং জনপ্রতি প্রতিদিন ১৫০০/-
* রুম ট্রিপল শেয়ারিং জনপ্রতি প্রতিদিন ১২৫০/-
*রুম ফোর শেয়ারিং জনপ্রতি প্রতিদিন ১২০০/-
টেন্টে থাকার খরচ ১২০০/- জনপ্রতি প্রতিদিন।
+91 6291538880
info@himalayanretreat.co.in

Monday, August 17, 2020

লেপচাখা, আলিপুরদুয়ার - Lepchakha, Alipurduar

 আজ আপনাদের পরিচয় করাবো আলিপুরদুয়ারের উওর দিকে এক পাহাড়ি গ্ৰাম "লেপচাখা"। এই নাম শোনেননি এমন ভ্রমনরসিক বাংঙ্গালি আজকের দিনে খুবই বিরল।বক্সা ব্যাঘ্র প্রকল্পের অন্তরগত সান্তালাবাড়ির থেকে মাত্র ৭ কি.মি দূরে অবস্থিত লেপচাখার পার্থিব সৌন্দর্যের সাথে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেব।

লেপচাখা ভারত-ভুটান সীমান্তের নিকটবর্তী বক্সা পাহাড়ের চূড়ায় অবস্থিত একটি ছোট গ্রাম তবে অত্যন্ত সুন্দর। বক্সা দুর্গ থেকে আরও 3 কিলোমিটার ট্র্যাক আপনাকে লেপচাখার মনোরম গ্রামে নিয়ে যাবে।লেপচাখার মূল আকর্ষণ হ'ল পাহাড়ের টেবিল এর মতো শীর্ষ অঞ্চল সেখান থেকে আপনি ডুয়ার্স অঞ্চলের সমস্ত নদী প্রবাহ দেখতে পাবেন। এটি একটি অসাধারণ সুন্দর দৃশ্য। এবং আমি মনে করি লেপচাখাকে বর্ণনা করার জন্য ব্যবহৃত সমস্ত বিশেষণগুলি ন্যায়সঙ্গত। উপরের দিক থেকে, আপনি বক্সা টাইগার রিজার্ভ, ভুটান পাহাড় এবং সুন্দর পার্শ্ববর্তী একটি প্যানোরামিক ভিউ পাবেন। গ্রামে একটি সাদা বৌদ্ধ স্তূপও রয়েছে যা ছোট্ট গ্রামের বাড়ির মাঝে দর্শনীয় দেখায়।


লেপচাখা মূলত ডুকপা অধিবাসীদের একটি ছোট্ট গ্ৰাম।এক ঝলক দেখলে মনে হবে আপনি ভূটানের কোনো গ্ৰামে অবস্থান করছেন।প্রসঙ্গত বলে রাখি অতীতে লেপচাখা ভূটানের অধিনে ছিল।পরবর্তীতে ইংরেজ শাসন কালে ভারতের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে।বর্তমানে লেপচাখাতে প্রায় ৭০ টি ডুকপা পরিবার বসবাস করেন।এরা মূলত বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী।গ্ৰামে ঢুকতেই একটি মনাষ্ট্রি আপনাকে স্বাগত জানাবে আপনার কিছু ক্ষণের জন্মে মনে হতে পারে আপনি হয়ত ভুটানের কোনও গ্রামে এসে পড়েছেন। প্রায় ৩০০০ ফুট হওয়ার জন্য এখানকার আবহাওয়া সারা বছরই বেশ মনোরম থাকে। গ্রামবাসীরা খুব শান্তিপূর্ণ এবং বন্ধুত্বপূর্ণ, বিশেষত বাচ্চারা। মানুষ দেখে তারা বেশ খুশি হয়। অনেকেই জয়ান্তী,বক্সাফোর্ট ঘুরতে এসে অনেকেই লেপচাখায় দু-এক দিনের জন্য ঢুঁ মেরে যায়।সৌন্দর্যের মাঝে লেপচাখায় একটি রাত কাটাতে এই জায়গায় পৌঁছানোর সমস্ত ঝামেলা পুরোপুরি মূল্যবান। লেপচাখায় সূর্যাস্ত নিঃসন্দেহে খুব সুন্দর।


লেপচাখা শান্ত ও নিরিবিলি গ্ৰামের জন্য পর্যাটকদের কাছে দিন দিন খুবই জনপ্রিয় হয়ে উঠছে।সন্ধ্যায় যদি আপনার আলিপুরদুয়ার ও হাসিমারার আলোর রোশনাই চোখে পড়ে তাহলে পরদিন সকালে পূর্বে সংকোশ নদী থেকে পশ্চিমে তোর্ষানদীর মাঝে বিস্তির্ন বক্সা বাঘবন চোখে পড়বে। কপাল ভালো থাকলে রাজ ধনেশের দেখা পেতে পারেন লেপচাখার আশেপাশে।

স্থানীয় বাসিন্দারা ধর্মীয় ও সংস্কৃতিক ভাবে বেশ রক্ষনশীল।তাই বছরের বিভিন্ন সময় পূজা পার্বন অনুষ্ঠিত হয়।বিশেষত, লোসার (নববর্ষ) ও চৈত্র সংক্রান্তিতে পূজার রীতিনীতি।কোন এক দুপুর বা বিকেলে হটাৎই শুনতে পারবেন "ওম মানি পদ্মে হুম" ।
লেপচাখা কে কেন্দ্র করে আপনি "ওছলুম, কাতলুং,রুপম ভ্যালি" ঘুরে আসতে পারেন।এছাড়াও উওরবঙ্গের উল্লেখযোগ্য শিব তীর্থস্থান "মহাকাল" দর্শন করে জয়ান্তী যেতে পারেন।


সবশেষে দকারি একটি কথা, আপনি ভাবছেন খুব সুন্দর জয়গা যেকোনো সময় যে কোনো বেক্তি পৌঁছে জেতে পারেন. তাহলে একটু ভুল হবে সান্তালাবাড়ির পর থেকে কোনো গাড়ি চলাচল করে না (গাড়ি চলাচলের উপযুক্ত রাস্তা না থাকার জন্য)। তাই যারা নিজের পায়ে ৪ কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে মায়ের মায়া ভরা কোলে যেতে চাইছেন, তাদের জন্য লেপচাখা তার সৌন্দর্যের ডালি নিয়ে অপেক্ষা করছে।


Jajabor Deb

Friday, August 7, 2020

বক্সা টাইগার রিজার্ভ - Buxa Tiger Reserve - Alipurduar

 বক্সা টাইগার রিজার্ভ - পর্ব ২:

দুপুরে খেয়ে বেরিয়ে পরি পোখরি হ্রদের দিকে। প্রকৃতি আবার আমাকে অবাক করল যখন জানতে পারলাম ১৪০০ ফিট উচ্চতায় অবস্থিত এই হ্রদের জল ১২ মাস একই থাকে। অবুঝ মনুষ্য জাতি এখানেও ভগবানের দোহাই দিয়ে দুটো ছোটো মন্দির স্থাপন করেছে।

জানতে পারলাম ওই হ্রদে একসাথে ঘর করে মাগুর আর কচ্ছপের দল। কিন্তু এখানেও আমার মন কাড়লো জঙ্গল আর প্রকৃতির নির্ভেজাল সুন্দর্য্য। গাড়ি থেকে নেমে ১.৫ কিমি পাহাড়ের গা বেয়ে আর জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে ট্রেক করে উঠতে হয়, সে রাস্তায় শুনেছিলাম শুকনো পাতার ওপর পরা পায়ের শব্দ, স্বাদ পেয়েছিলাম এক অসীম স্বাধীনতার, গন্ধ নিয়েছিলাম গন্ধহীন সেই জঙ্গলের , দেখেছিলাম ছোটো বড় অনেক সুন্দর সুন্দর কিট পতঙ্গের দল, অনুভব করেছিলাম নিজের অস্থিত্ব।

নিচে জয়ন্তীর কলকল শব্দ শুনতে শুনতে ওপরে ওঠার সময় গাছের ফাঁক দিয়ে একবার নিচের দিকে চোখ রাখলে দেখা যায় দিগন্ত বিস্তৃত এক জঙ্গল যার রূপে রঙে এত ভিন্নতা তাকে একটি ছোটো অ্যামাজন করে তুলেছে। সবার মত আমিও মুড়ি খাওয়ালাম মাংসাশী সেই মাগুরদের।

বাবার ডাকে ফিরে আসলাম বর্তমান সময়, সেই মায়াবী রাতে। বাধ্য মেয়ের মত ঘরে ঢুকে ঘুম লাগলাম। পরের দিন সকালে উঠে কোকিলের ডাক শুনছি এমন সময় ফোন আসলো মোহন দার, বললো সকালে ভুটিয়া আর চুনিয়া বসতি ঘুরে আসা যেতে পারে। ৩০ মিনিটের মধ্যে বেরিয়েও পরলাম।

ভুটিয়া বসতি আরো নিস্তব্ধ। জঙ্গলের গায়ে মাথা রেখে খুব শান্ত ভাবে ঘুমাচ্ছে গ্রামটা। এই বসতি চারিদিক দিয়ে শুধু সবুজে ঘেরা। এখানেও একটা থাকার ব্যবস্থা আছে। রাতের ঘুটঘুটে অন্ধকারে রাত কাটানোর মজাটা এখানে পুরো আলাদা। ভুটিয়া বসতি ছেড়ে আমরা চললাম চুনিয়া নদীর ওপর দিয়ে চুনিয়া ওয়াচ টাওয়ারের দিকে। চুনিয়ার শুকনো বুকের ওপর বেড়ে উঠেছে আরেক সুন্দর জঙ্গল। প্রত্যেক বর্ষায় সে জঙ্গল রূপ বদলায়। সাদা পাথরের পথ, আকাশে নিলের ছাউনী আর দুপাশে সবুজের ব্যারিকেড। যত দেখছি তত অবাক হচ্ছি। সেই জঙ্গলে শুধু আমরা, চার পাশে অনেক দুর অবধি নজর রাখলেও দেখা যায় না কোনো মনুষ্য প্রাণ। এই যাত্রাও শেষ হলে ঘণ্টা দেড়েকের মাথায়।

আজ এই স্বর্গীয় আস্থানা ছেড়ে দেবো। তার আগে শেষ বারের মত জঙ্গলকে আলিঙ্গন করব জয়ন্তী বনের সাফারীতে গিয়ে। স্নান খাওয়ার পর বেরিয়ে পরলাম জয়ন্তী নদীকে বিদায় জানিয়ে। ম্লান হয়ে গেল সকল উত্তেজনা। শেষ বারের মত চিকন কালো পাকা রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলের কার্পেটে পা রাখলো আমাদের জিপসি। এই বনের কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার বেলা এসে গেছে।

বিদায় জানাতে হবে এই চারিপাশের অপরূপ সবুজকে, চারিপাশে উরে যাওয়া পাখি, প্রজাপতির দলকে, সেই ময়ূর মায়ুরীদের। হরিণের একদল হঠাৎ জঙ্গল থেকে বেরিয়ে ছুটতে লাগলো আমাদের গাড়ির সামনে। প্রকৃতি শেষ বারের মত একটা উপহার দিয়ে জানো বলতে চাইল, "আবার আসিস"। আসবো তো নিশ্চই, এই জঙ্গল কি আর ভোলা যায়? নাড়ির টান তৈরি হয়ে গেছে জানো তার সাথে। বক্সা রিজার্ভের বন এখনও কুমারী, অনাবিষ্কৃত, অপরিচিত কিন্তু আমার মতে এ আমাজনের ছোটো জ্ঞাতি ভাই। দুয়ার্স আগে অনেক বার দেখেছি কিন্তু এরকম প্রকৃতির অস্থিত্ব আর কোথাও টের পাইনি।

বক্সা টাইগার রিজার্ভ ছেড়ে আমরা এবার পারি দিলাম সিকিয়াঝোরার দিকে। ওখানে যাওয়ার একমাত্র উদ্দেশ্য সিকিয়াঝোরার নদীর সাফারি। সিকিয়াঝোরা নদীটিকে দুপাশ দিয়ে ঘিরে রেখেছে বক্সা জঙ্গলের শাখা প্রশাখা। উচ্ছতায় নিম্ন হলেও ঘনত্ব কোনো অংশে কম না। মাঝি ভাইদের কাছে শোনা গেলো এই জঙ্গল থেকে হাতি নেমে মাঝে মাঝেই এই জলে স্নান করে, খেলা করে যায়।

নদী সাফারির শুরুতে একটু কেমন মরা মরা লাগছিল সব কিছু, বক্সার ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারিনি ঠিক। কিন্তু মানব সমাজের তৈরি কৃতিম নৌকার ঘাট পেরিয়ে একটু এগোতেই আবার সেই বক্সার কথা মনে পরে গেলো। কুমারী সেই জঙ্গলের নিস্তব্ধতার আওয়াজ শুনতে শুনতে হটাৎ রাঙিয়ে গেলাম চারিদিকের সবুজে। গাছের ছাউনির মাঝে মাঝে দেখা যাচ্ছে ছোট্ট একটু নিল আকাশ। জলের ওপর দিয়ে খুব ধীর গতিতে চলতে লাগলাম। চোখ বন্ধ করলেই অনুভব করা যাচ্ছিল প্রকৃতির শেষ আদর। নানান পাখির কোলাহল শুনতে শুনতে এই যাত্রা টাও শেষ হয়ে গেলো। চারিদিকের সেই নির্ভেজাল গাঢ় সবুজকে শেষ বারের মত মন ভরে দেখে বিদায় নিলাম প্রকৃতির এত যত্ন করে সাজানো এই ভূস্বর্গ থেকে।

এই বেড়ানোটির প্রতিটি অনুভূতি ব্যক্ত করতে গেলে গল্পো উপন্যাসের রূপ নেবে। একটা কথা বলতে পারি দৃঢ়তার সাথে যে আমাদের মত যারা সপ্তাহে দুটি দিন বাঁচার জন্য বাকি পাঁচটি দিন নিজের সাথে আর পৃথিবীর সাথে লড়াই করেন তাদের জন্য এই জয়গা আদর্শ। পরিণত লেখকদের মত না পারলেও চেষ্টা করলাম নিজের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের অভিজ্ঞতা যথা সম্ভব লেখাই তুলে ধরতে। জানাবেন কেমন লাগলো।


Pritha Guha

Friday, July 17, 2020

বক্সা টাইগার রিজার্ভ - Buxa Tiger Reserve - Alipurduar

 বক্সা টাইগার রিজার্ভ - পর্ব ১ :

বৃষ্টির কান-ফাটা শব্দে ঘুমটা ভেঙে গেলো রাতের কোনো এক গভীর সময়। পাশেই জানলা, পর্দাটা একটু সরিয়ে কাঁচের ওপারে দেখার চেষ্টা বৃথা হলো, দূর্ভেদ্য অন্ধকারে চারিদিকটা ঢাকা পরেছে। আমার বুদ্ধিমান ফোনটাকে একটু ধরে ঝাঁকাতেই তার পেছনের টর্চ জলে উঠলো। বিছানা থেকে কাঠের মেঝেতে পা রাখতেই মেঝেটা বিরক্তের সাথে ক‍্যাচ্ করে উঠলো। হাওয়ার আওয়াজে দরজাটা আলতো দুলছে, কাছে গিয়ে কান পাতলে শোনা যায় হাওয়ার সাঁই সাঁই শব্দ, সেই শব্দ পরিবেশটাকে আরো বেশ খানিকটা ছমছমে করে তুলেছে।

দরজাটা খুলে বাইরের বারান্দায় এসে দাড়ালাম। ঠাণ্ডা হাওয়ার সাথে বৃষ্টির ছাঁট গায়ে ছুঁয়ে সারা শরীরে কাঁটা দিয়ে যাচ্ছে। মুশুলধারে বৃষ্টি পড়ছে টিনের চালের ওপর, একটা ভেজা চেয়ারের ওপর গিয়ে বসলাম। আমার বুদ্ধিমান ফোন বলছে ১:৪২ বাজে। ফোনের আলোটা বেশ বিরক্তকর, টেবিলের ওপর দিলাম ওটার মুখ উল্টে। সামনের নির্ভেজাল অন্ধকারের দিকে চোখ রাখতেই কেমন একটা রোমান্টিসিজম জড়িয়ে ধরলো চারিদিক দিয়ে। এই বক্সা টাইগার রিজার্ভের মাঝে আর জয়ন্তী নদীর কাখে অবস্থিত জয়ন্তী রিভার ভিউ হোমস্টেতে এসেছি গতকাল, থাকবো আগামীকাল অবধি। ফ্ল্যাশব্যাকের মত চোখের সামনে ভাসতে লাগলো পূর্ব পর্বের কথা।

অনেকদিন ধরে বোকা বাক্সকে (অর্থাৎ কম্পিউটারকে) খোঁচা মেরে মেরে আর তার ইঁদুরের ঘাড় নারিয়ে ইন্টারনেট বাবাজির থলি তন্যতন্য করে খুঁজে বার করেছিলাম এই জায়গাটার আপাদমস্তক সব তথ্য। কাঞ্চনকন্যায় সিট সংরক্ষণ করেছিলাম প্রকৃতিকে আরও কিছুটা বেশি উপভোগ করতে। নিউ জলপাইগুড়ি ছাড়ার পর কখনও চেনা অচেনা নদীর ওপর দিয়ে, তো কখনও দূর্ভেদ্য জঙ্গলের বুক চিরে কাঞ্চন নন্দিনী আমাদের আলিপুরদুয়ার পৌঁছে দিয়েছিল নির্ধারিত সময়ের ঠিক ২ ঘণ্টা পর। প্রথম দেখাতেই প্রেমে পড়ে গেছিলাম এই শত শত রকমের গাছের গভীর সারির। ৭৬০ বর্গ কিলোমিটার জুড়ে ঘর বেঁধে রয়েছে এই ইকোলজিকাল হটস্পট, প্রকৃতি প্রেমীদের কাছে এক অর্থে স্বর্গ। একদিকে যদি হয় নাম না জানা গাছের অভেদ্য বসতি, তাহলে অন্য দিকে শাল বনের সরলতা। এতে মন না ভরলে রয়েছে গর্জনের ঘন ছাউনী, সাভানা গ্রাসল্যান্ডের মানুষ সমান ঘাসের সারি আর শতক হাজার বছরের সাক্ষী হিসাবে রয়েছে কিছু মরা, কিছু আধ মরা আর কিছু জীবন্ত গাছের প্রাণ। সব মিলিয়ে প্রায় ৪৫০ প্রজাতির জানা অজানা গাছের চিরন্তন ঠিকানা লুকিয়ে আছে এই ১০ রকমের জঙ্গলের মধ্যে।

স্টেশন থেকে ১৫ কিমি দূরে রাজাভাতখাওয়া জঙ্গলের প্রবেশ দ্বার, সেখান থেকে যৎসামান্য টাকা আর পরিচয় পত্রের বিনিময় পরের তিনদিন জঙ্গলে থাকার আর ঘোরার অনুমতি পত্র আদায় করে আমরা প্রবেশ করলাম সবুজ নির্ভেজাল, নির্লোভ, নিঃস্বার্থপর এই প্রকৃতির ছাউনীতে। জঙ্গলের মাঝ দিয়ে চলে গেছে ঝা চকচকে পাকা রাস্তা, গাড়ির জানলার ওপর হাল্কা করে মাথাটা এলিয়ে দিলে খুব মিষ্টি হাওয়া এসে আদর করে যায়, মনে করিয়ে দেয় ভুলে যাওয়া ফাল্গুনের সেই প্রসন্ন আবহাওয়া। সূর্যের আলো দুধারের গাছের সারির ওপর গয়না পরিয়েছে। আরও ১৫ কিমি গাড়িটা ছুটে চললো খুব যত্নে আঁকা এই ক্যানভাসের ওপর দিয়ে, তারপর পৌঁছালাম জয়ন্তী নামক এই ছোট্ট বসতিটিতে, মোট সময় লাগে প্রায় ১ ঘণ্টা। ঠিক এই গ্রামটির গা এলিয়ে চলে গেছে জয়ন্তী নদী। বর্ষাকালের তিনটি মাস এই নদী ভয়াবহ রূপ নিলেও, বছরের বাকি সময়টা থাকে শুধু শুকনো নদী গর্ভের সাদা পাথরের ওপর দিয়ে করা স্বচ্ছ জলের আঁকিঝুকি। মাত্র ২০০০ প্রাণ নিজেদের ঘর, স্কুল, দোকান, স্বাস্থ্য কেন্দ্র নিয়ে নিজেদের মতো করে একটা পুরো ভিন্ন পৃথিবীর স্থাপন করেছে। আর এই পৃথিবীতে নিজদের বাড়ি গুলিকে হোমস্টেতে রূপান্তরিত করে প্রকৃতি প্রেমীদের সুযোগ করে দিয়েছে এই স্বপ্নের মতো অস্থানায় এসে নিশ্বাস ফেলার।

সেদিন বিকালে এসেই বেরিয়ে পড়েছিলাম ছোট মহাকাল মন্দিরের উপলক্ষ্যে, স্ট্যালাকটাইট আর স্টালগেমাইট এর তৈরি এই গুহারর পরিচয়ের বদল ঘটেছে ধর্ম ভীরু মনুষ্য জাতির দয়ায়। আমাদের জিপসি গাড়ি জয়ন্তী নদীর এব্রক্ষেব্র বুকের ওপর দিয়ে কোনো তোয়াক্কা না করে ঊর্ধ্বশ্বাসে লাফাতে লাফাতে চলছিল, মাঝে মাঝে তাকে শান্ত করে তুলছিল হাল্কা স্রোতে বোয়ে যাওয়া এই জয়ন্তীর কিছু নাড়ি। চওড়া নদী বক্ষের দু ধারের ঘন জঙ্গলে ঢাকা পাহাড় ধীরে ধীরে কাছে আস্তে লাগলো। বা দিকের জঙ্গল এবার রূপ ধারণ করলো সাভানা গ্রাসল্যান্ডের, কিন্তু ডান দিকটা তখনও গো ধরে বসে রয়েছে তার পূর্ব সাজ নিয়ে। আরও কিছু দূর গিয়ে মহাকালের পাহাড়ের পদ ভূমিতে এসে শান্ত হলো গাড়ির ইঞ্জিন।

নদীর পাশ দিয়ে, পাহাড়ের গা বেয়ে কিছুটা উঠে দেখা মিলল স্টালাক্টাইট আর স্টালেগমাইটের গঠন গুলোর, ছোটো হলেও প্রথম দেখাতে ভালোই মন কারলো। পাশে ছিল একটা ছোটো ঝর্ণা। বড়ো মহাকাল আরো অনেক উঁচুতে, রীতিমতো ট্রেক করে উঠতে হয় কিন্তু উপহার স্বরূপ পাবেন আরো সুন্দর প্রকৃতি, আরো বিস্ময়কর গুহা আর আরো রোমাঞ্চকর এক অনুভূতি। একটা কথা তো বলাই হলো না, রাজাভাতখাওয়া জঙ্গলে পা ফেলার পর থেকে আমাদের গাইড হিসাবে রয়েছে অসংখ্য রঙবেরঙের পাখি, প্রজাপতি আর ময়ূর, কিছুটা ভালো করে লক্ষ্য করলে নজরে পরবে নানান রঙ রূপে সজ্জিত কিট পতঙ্গের দল। জিপসি আমাদের হোমস্টেতে নামিয়ে দিল সন্ধ্যা হাওয়ার কিছু আগেই। পূর্ণিমার রাতে জয়ন্তী সজ্জিত কনের মত সুন্দর লাগে। সাদা পাথর চাঁদের আলোর আভায় আরও স্নিগ্ধ হয়ে উঠেছে। রাতের নিস্ত্ধতায় কান পাতলে শোনা যায় স্বল্প জলের কোলাহল, নিশির আলো তার গায়েও মাখিয়ে দিয়েছে অজস্র অভ্র। চাঁদও জানো পৃথিবীর এ রূপ দেখে নেচে উঠেছে। কিন্তু সে রাতেও বৃষ্টি হয়েছিল। রাতের শেষ অধ্যায় অবধি দেখা যায়নি চাঁদের থালার মত গোল মুখখানি।

বিদ্যুতের গর্জনে ঘোর কাটল। বৃষ্টি আরও জোরে ধেয়ে আসছে পৃথিবীর দিকে। গায়ে একটা হাল্কা চাদর জড়ানো ছিল, সেটাতেও মানছে না ঠান্ডা, ঠিক সকালের মত। আজ সকালে ঘুম ভেঙেছিল দিনের প্রথম আলোর সাথে। বাইরে পা দিতেই গায়ে লাগলো বেশ ঠান্ডা হিমের হাওয়া। পাহাড় তখনও কুয়াশার চাদর গায়ে, বৃষ্টিতে স্নান করে গাছের রঙ আরও ফুটে উঠেছে। পাখিদের কিচিরমিচির শব্দে আড়মোড়া ভাঙছে ঘুমন্ত গ্রামটা। প্রকৃতির আলসেমি দেখতে দেখতে হোমস্টে ছেড়ে এগিয়ে গেলাম নদীর গর্ভে ওই নতুন হওয়া জলের প্রবাহর দিকে। ঘোলাটে জল হলেও পাথর গুলো ভালোই পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। হঠাৎ উল্কির মত বৃষ্টি পরতে লাগলো। ফিরে এসে কম্বলের তোলাই আর এক পর্ব ঘুমের উপক্রম করতে লাগি। ৮ টার দিকে যখন আবার ঘুম ভাঙলো তখন বৃষ্টি থেমে গেছে। আজ যাবো পাকা রাস্তা ছেড়ে জঙ্গলের ভেতরের কাঁচা রাস্তা দিয়ে জঙ্গলটাকে আরও কাছ থেকে দেখতে। রাজাভাতখাওয়ার প্রবেশ দ্বার থেকে সাফারির বিশিষ্ঠ জিপসি করে ঢুকলাম জঙ্গলের গভীরে।

সে এক অপরূপ শোভা। গাড়ি চলেছে এক পাশে সাজানো গোছানো শালের বন আর অন্য পাশে বহু পুরনো গাছের অগোছালো বসতির মধ্যে দিয়ে। এই বনের সাজ বদলাচ্ছে মুহূর্তের মধ্যে। একটি নাম না জানা গাছ সটান উঠে গিয়ে ছুয়েছে আকাশের নীল শরীরে, গাড়িটা থামলো হঠাৎ তার ঠিক পাশে। আমাদের গাইড মোহন দার দিকে তাকাতেই নজরে পরলো এক অদ্ভূত উৎকণ্ঠা, জিজ্ঞাস করায় জানতে পারলাম যে তারা হাতির গন্ধ পাচ্ছে, নিশ্চই খুব কাছে। জঙ্গলে পশু দেখার আশায় কোনোদিনই আসি নি, কিন্তু চারিদিক দিয়ে যখন গভীর সবুজে ঘেরা, হার হিম করা নিস্তব্ধতার মাঝে আমাদের অশান্ত জিপসি শান্ত ভাবে ভয়ে কুকরে দাড়িয়ে আছে তখন কি জানো একটা আমাকেও ভর করলো। শুকনো পাতা পরার আওয়াজেও কেপে উঠছে মন টা। খানিকক্ষণ অপেক্ষা করে গাড়ির ইঞ্জিন মৃদু স্বরে আওয়াজ করে চলতে লাগলো।

বনেরও এক আলাদা অদ্ভুত গন্ধ আছে, বিজ্ঞান ঘ্রাণ বন্দী করার কোনো এক যন্ত্র আবিষ্কার করলে বনের সেই গন্ধকে ধরে আনতাম আমার সাথে কলকাতায়। স্বপনের মত লাগছিল এই জঙ্গলে ঘোরার অভিজ্ঞতা, পাখি উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে, প্রজাপতি খেলে বেড়াচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে, ময়ূর কোথাও পেখম তুলে মায়ুরীকে ইশারা করছে তো আবার কোথাও আমাদের মাথার ওপর দিয়ে এক ডাল থেকে অন্য ডালে উড়ে যাচ্ছে। মাথার ওপর এক ফালি নিল আকাশ ছাড়া বাকি চারিপাশ রাঙিয়ে রয়েছে সবুজের বিভিন্ন রঙে। মাঝে মাঝে জঙ্গল ছেড়ে শুকনো বালা নদীর ওপর দিয়ে যাচ্ছে আমাদের সাওয়ারী। ঘরে ফিরে আসলাম ঘণ্টা দুয়েক পরে।


Pritha Guha

Tuesday, July 7, 2020

দামাল হাতির দেশে দলমায়(ঝাড়খণ্ড) - Dalma Wildlife Sanctuary(Jharkhand)

আজ 3rd মার্চ World Wildlife Day... শহুরে আধুনিকতার জীবনে অভ্যস্ত আমাদের সবাইকে প্রকৃতির সান্নিধ্যে কয়েকটি দিন যাপনের জন্য কত যে কাঠ খড় পোড়াতে হয় তা সর্বজন বিদিত। কখনও ছুটির জন্য যুদ্ধ, কখনও টিকিটের লম্বা লাইন আবার কখনও accomodation এর সমস্যা।তাও এত ঝক্কি ঝামেলা সামলে দু তিনটে দিনের জন্যে প্রানভরা বিশুদ্ধ প্রশ্বাসের আশায় পাড়ি দিয়ে থাকি কাছে দুরে হরেক দুরত্বের গন্তব্যে। সেই রকম এক গন্তব্যে থাকার অভিজ্ঞতা ভাগ করার আশায় এই পোস্টটি। এইবারের আমাদের গন্তব্য ছিল ঝাড়খন্ডের গভীর গহন অরণ্যে Dalma Wildlife Sanctuary...



ট্রেন পথে কলকাতা থেকে মাত্র সাড়ে ৩ ঘণ্টার দুরত্বে গভীর জঙ্গলের মধ্যে Makula Kocha Forest Guest House এর সন্ধান যখন আমার এক আত্মীয়ের কাছ থেকে পাই তখন আর লোভ সামলাতে না পেরে বুকিং করে ফেলি ফরেস্ট অফিসার এর সাথে কথা বলে। কলকাতার এত কাছে প্রকৃতির সান্নিধ্যে এত সুন্দর থাকার ব্যবস্থা থাকতে পারে তা স্বচক্ষে না পরখ করলে বোঝা দায়। রেস্ট হাউস চত্ত্বরটিতে পাহাড়ের কোলে গভীর জঙ্গলের মধ্যে শহুরে সব আধুনিকতা থেকে শত যোজন দূরে। দুই তিনটে দিন অনায়াসে এখানে কাটিয়ে যায়।




**কিভাবে যাবেন --ট্রেনে কলকাতা থেকে টাটানগর ।সময় লাগে প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা। টাটানগর স্টেশন থেকে 35kms দূরে দালমার পাহাড়ে Makula Kocha Forest Guest House।
**কখন যাবেন-- বর্ষা কাল বাদ দিয়ে যে কোন সময়। মার্চ এপ্রিল মাসে গেলে বাড়তি পাওনা পুরো জঙ্গলের মধ্যে রাস্তায় দুপাশে সারি দিয়ে শিমুল পলাশের আগুন রাঙা সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করা। আর এই সময় হাতির দেখা মেলে জঙ্গলের মধ্যে।
**থাকার ব্যবস্থা -- Makula Kocha Forest Guest House বুকিং এর জন্য সরাসরি কথা বলুন ফরেস্ট অফিসার Mr. Rana র সাথে 9304323110



পুরো গেস্ট হাউসে ৩টি cottage ও ৪টি semi cottage ache.... cottage গুলোর ১১০০/- এবং semi cottage গুলো ৬০০/- করে ।
আর খাওয়া গাড়ির ব্যবস্থার জন্য কথা বলুন Debu Ghosh এর সাথে। আমাদের টাটানগর স্টেশন থেকে ফরতি স্টেশন অবধি ৩টি দিনের সমস্ত tour টার দায়িত্ব উনি নেন। খুব অমায়িক মানুষ উনি।
Debu Ghosh-9852025400
**ঘুরে দেখবেন-- Dalma Hill top, Pindrabera, Chandril dam, Dimna lake, Jubilee park


Somali Das

Sunday, June 7, 2020

মহলদিরাম দার্জিলিং - Mahaldiram Darjeeling

 ঘুরতে যাবার প্রস্তাব টা হঠাৎ করেই আসে আমার কাছে দিদি জামাই বাবুর কাছ থেকে...পরিকল্পনা মতোই আমাদের যাওয়ার দিন ঠিক হলো 16 ই মার্চ... ট্রেনের টিকিট পেয়ে গেলাম হাওড়া থেকে আগরতলা হামসাফার এক্সপ্রেস... হাতে ছুটি বলতে খুব বেশি দিন ছিল না.. কোন ভাবে অফিসে ম্যানেজ করে দু দিনের ছুটি মঞ্জুর করলাম.. এবং 16 ই মার্চ সন্ধ্যেবেলা পরিকল্পনা মতোই বেরিয়ে পড়লাম ট্রেন ধরতে..

ওহহ বলতে ভুলে গেছি আসল জিনিসটাই এবারের আমাদের গন্তব্য....
*#মহলদিরাম*
নামটা একদমই অজানা তাই না!!!!
জায়গাটাও একদমই অজানা!!!
দার্জিলিং জেলার একটি ছোট্ট পাহাড়ি গ্রাম নাম #মহলদিরাম*

17 ই মার্চ সকাল সাড়ে ছয়টায় ট্রেন নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশনে পৌঁছালো... আমাদের যে গাড়ি বলা ছিল সেই গাড়িতে করে মহলদিরাম পৌঁছতে মোটামুটি 3 ঘণ্টা লেগে গেল.. রাস্তার দুপারের পাইন জঙ্গল, খাদ, নদী এইসব প্রাকৃতিক সৌন্দর্য চোখ ভরিয়ে দিল... রাস্তাও ছিল অনেকটাই চড়াই..
অবশেষে আমরা পৌঁছালাম আমাদের গন্তব্য স্থান *#মহলদিরাম*|||

সিটং ও লাটপাঞ্চার পেরিয়ে এই গ্রাম.....জায়গাটির উচ্চতা সমতল ভূমি থেকে প্রায় সাড়ে 6 হাজার ফুট..
মূলত এখানে থাকার জায়গা হোমস্টে *"স্যালামান্ডার জঙ্গল ক্যাম্প"* কিন্তু আমরা আকস্মিক ভাবেই সাধারন
হোমস্টের থেকে অনেক বেশি সুযোগ-সুবিধা পেয়েছি... চা বাগান এর মধ্যেই তৈরি হোমস্টে..
পৌঁছানোর সাথে সাথেই হোমস্টের ম্যানেজার বাপি বাবু আমাদের গলায় উত্তরীয় জড়িয়ে আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন...
যেমন আতিথেয়তা তেমন ব্যবহার আর ঘরের ভেতর পৌঁছে আমরা অবাকই হলাম আমরা কল্পনাও করতে পারিনি যে এখানে এসে আমরা এত সুযোগ স্বাচ্ছন্দ পেতে পারি.. ঘর বাথরুম পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং সুন্দর করে সাজানো...

কিন্তু পৌঁছে থেকেই মনটা কেমন একটা খারাপ খারাপ লাগছিল কারন আকাশে মেঘ থাকার কারণে আমাদের কাঞ্চন মানে "কাঞ্চনজঙ্ঘা" কে একদমই দেখা যাচ্ছিল না... দুপুরের স্নান করে একদম বাঙালি খাবার পেট ভরে খেয়ে আপ্লুত হয়ে বেরিয়ে পড়লাম আশপাশে গ্রাম ঘুরতে... সন্ধ্যে এখানে নামে খুব তাড়াতাড়ি.. সন্ধ্যেবেলা ভেজ পকোড়া আর চায়ের সাথে আড্ডা টাও জমে গেল... রাতে আমাদের অনুরোধ মেনেই ম্যানেজার বাবু চাউমিন এবং চিলি চিকেন করে দিলেন খাবার জন্য...
রাতে ঘুমোতে গেলাম মনে এই আশা নিয়ে কাল সকালে উঠে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাবো...

কিন্তু পরদিন সকালে উঠে দেখলাম আবহাওয়া আরো খারাপ.. পুরো আকাশ মেঘে ঢেকে রয়েছে.... সকালে গাড়ি নিয়ে সাইটসিন এ বেরোনো হল গন্তব্য ছিল 'ডাওহিল' আর কার্শিয়াং "ফরেস্ট মিউজিয়াম"...
ফিরে লাঞ্চ কমপ্লিট করে বিকেলে গেলাম কাছের একটি "মনস্ট্রি"তে... মানুষজনের ব্যবহার এতই ভালো মন ভালো হয়ে গেলো...
সন্ধ্যাবেলা আকস্মিকভাবেই প্রবল ঝড় বৃষ্টি শুরু হল... সাথে পেলাম শিলাবৃষ্টিও...

রাতের খাবার খেয়ে ছাদে উঠতেই মনটা হঠাৎ আনন্দে ভরে গেল.. দেখলাম আকাশ একদম পরিষ্কার... সাথে দেখতে পেলাম দূরে প্রচুর গ্রাম এবং গ্রামগুলিতে ঝকমক করে আলো জ্বলছে... যেন পূর্ণিমার আকাশে অসংখ্য তারা একসাথে জ্বলছে... ফ্রেমবন্দি করলাম ওই রাত 11.30 tar সময়...এক মনোরম আলো-আঁধারি পরিবেশে সম্মুখীন হলাম... মনের তীব্র আশা জাগলো কাল সকালে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাবো...
অবিশ্বাস্য ভাবে হতাশ হতে হলো না কিছুটা হলেও আমরা কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পেলাম... চলে আসতে হবে ভেবে মন খারাপ হয়ে যাচ্ছিল জায়গাটি ছেড়ে আসতে একদমই ইচ্ছা করছিল না...

কিছু জায়গা থাকে যেখানে একা বসে থাকলেই মন ভালো হয়ে যায় মহলদিরাম জায়গাটি তাদের জন্যই... এক অপূর্ব নিস্তব্ধতা, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন পরিবেশ সামনে চা বাগান, সন্ধের আলো-আঁধারি পরিবেশ এবং ছাদ থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে পাওয়ার মজাই আলাদা...
হোমস্টের কেয়ারটেকার মঙ্গলের হাতের রান্না এবং ব্যবহার আলাদা কৃতিত্বের দাবি রাখে...
19 তারিখ সকালে মহলদিরাম কে বিদায় জানিয়ে আমরা এগোলাম.... গন্তব্য দার্জিলিং.. এখান থেকে 3 ঘন্টা দার্জিলিং... বাতাসিয়া লুপ ঘোরা, টয়ট্রেন আর গ্লেনারিস এ লাঞ্চ যেন আলাদা নস্টালজিয়া খুব বেশি সময় না থাকায় এতেই সন্তুষ্ট থাকলাম... দুপুর 3 টা নাগাদ রওনা দিলাম নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন এর উদ্দেশ্যে.. ঠিক সন্ধ্যে সাড়ে সাতটায় পদাতিক এক্সপ্রেস এ উঠে পড়লাম এবং পরদিন সকালে চলে গেলাম শিয়ালদা স্টেশন...

***শুধু এটাই বলব *#মহলদিরাম* তুমি এ রকমই থেকো ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে যেও না....
অপরিচিত জায়গা গুলো সব সময় হয়তো এতটা ভালোই হয় আর তাই জায়গাগুলো অপরিচিত থাকাই ভালো....

Ayan Bishayee

Friday, June 5, 2020

লাভা, কালিম্পঙ - Lava, Kalimpong

 ছবিটি লাভা তে তুলেছিলাম । কয়দিন থেকেই লাভা নিয়ে লেখার খুব ইচ্ছা হচ্ছিল । বন্ধু সুমি বলছিল ও লাভা খুব ভালবাসে । অথচ লাভা যায় নি । ব্যাপারটা খুব আশ্চর্য । আশ্চর্য নয় কি ? আসলে লাভা কথাটির অর্থই এক সুন্দর কবিতার মত । লা - ঈশ্বর , ভা - উপস্থিতি ।

                                                            Just after leaving Garubathan

আমার ভ্রমণ যাওয়া আর ফিরে আসা । এই পথ দেখতে দেখতে যাওয়া আর আসাই আমার ভ্রমণ ।সুমি , তুমি যেমন কোনদিন লাভা না গিয়েও লাভাকে নিয়ে কবিতা লিখতে পার , আশ্চর্য সুন্দর করে গান গাইতে পার , ওমনি আমিও মাত্র দু ঘন্টা ঘুরেছিলাম । ঠিক করেছিলাম আবার আসব লাভা । সেবার বুড়ো মামাকে নিয়ে খুব অসুবিধায় পড়েছি । মামা শুধু বলে আমি বসি , তুমি ঘোর । আরে তা কি করে হবে । আমি হাঁটতে থাকব , তারপর রাস্তায় গাড়ি পেলে উঠে পড়ব । তোমাকে কোথায় বসিয়ে রাখব । বছর সাত হয়ে গেছ জান , লাভা ঘুরেছিলাম । এখন আমিও বুড়োর খাতায় । তুমি এবার হাত ধরে থেকো । বাস্তবে না পার , তুমি স্বপ্নতেই আমার হাত ধর । আবার আমি লাভা যাব । সুমি এবার তোমার হাত ধরে । নতুন করে ছবি আঁকব ।

                                                            Looks so Dangerous

বেশী জন লাভার দিকে যায় , এন জি পি থেকে তিস্তা বাজার , কালিম্পং হয়ে লাভা । আমি নিয়ে যাব তোমায় ডামডিম হয়ে । সে এক আশ্চর্য সফর করেছিলাম আমরা । খুলে বলি । এত দিন পরও একটু চোখ বুজলেই আমার সব ছবি আর পথের কথা মনে পড়ে যায় । সকাল বেলাতেই সেদিন আমরা চালসার হোটেল ছেড়েছি । হোটেল মালিক বলেছিল বেলা ৮-৩০ একটা ট্রেকার আসবে । ওটা কালিম্পং নিয়ে যাবে । আমি উঠি ভোর পাঁচটার আগে । এত সময় নষ্ট করব ? চালসা মোড়ে এক পথচারী পরামর্শ দিল , এখনই (৬) একটা গাড়ি পাবে মালবাজার যাবে । ওখান থেকে আবার গাড়ি পাবে শিলিগুড়ি যাবার । পথে ডামডিম নেমে যাবে । ওখান থেকে আবার গাড়ি । আমার তো এমন পথের নিশানা পেয়ে মন নেচে উঠল । ডামডিম নেমে এক দোকান এ নাস্তা ।
                                                                    After Landslide
ভাগ্যিস ভাল ভাবে নাস্তা করেছিলাম । তারপর সারাদিন মামাকে আধপেটা করে রেখেছিলাম গো । যাক গল্পটা করি । দোকানদারকে এবার ধরলাম লাভা কি ভাবে যাব । দোকানদার সেই গাড়িটার কথাই বলল । যেটা আমরা চালসা থেকেই ধরতে পারতাম । আমি জানতে চাইলাম আর কোন উপায় নাই । এতক্ষন এভাবে বসে থাকব ? তখন দোকানদার বলল , এখান থেকে সব ম্যাজিক্ গাড়ি যাবে । ওটাই উঠে গরুবাথান যেতে পার । ওখান থেকে লাভার গাড়ি পাবে । শুনে ভালই লাগল । অল্প সময় হলেও গরুবাথানও ঘোরা হবে । গরুবাথান যাবার পথটাও কি সুন্দর । দু ধারে চা বাগান । গাড়ি মাঝে মাঝে দাঁড়াচ্ছে । লোকাল লোকজন উঠছে । মন্দ লাগছিল না জানো । লোকাল লোকজনদের সাথে গাড়িতে দু একটা করে কথা বার্তাও শুরু হল । জানতে পারলাম আজ গরুবাথানে হাট বসবে । এখন আর মনে নেই । সেদিন কি বার ছিল । খুব সম্ভব রবিবার । আমার হিসাব তাই বলছে । যাই হোক ডুর্য়াসে হাট দেখা নিয়ে আমি খুব উত্তেজিত হয়ে গেলাম । সেই সব দিনকাল হয়ত এখন আর নেই । তবু হাটে কত রকম মানুষ জন । নিশ্চয় ভাল কিছু ছবি তোলার আশায় রইলাম ।
                                                                        At Lava

গরুবাথানে একটা লাভা যাবার গাড়ি এখুনি ছাড়বে । হাতে মাত্র ১০-১৫ মিনিট । টিকিট কেটে মামাকে গাড়িতে রেখে আমি হাটে এলাম । হাট এত সকালে তেমন জমে নি । আর গরুবাথানের এই শহর অঞ্চলটি একবারে ঘিঞ্জি । একটু হতাশই হলাম । একটা দুটো পর্টেট তুললাম । আমাদের গাড়িও ছেড়ে দিল । একবারে টাইমের গাড়ি । আর আমার ভাগ্য আজ গাড়িতে লোকজন কম । আর আমি একটা জানালার ধারে ।
ঘিঞ্জি শহরটা শেষ হতেই গাড়ি পাহাড়ী রাস্তা ধরল । আলাদীনের আশ্চর্য প্রদীপ এর মত পুরো পৃথিবী ১০-১৫ মিনিটের মধ্যে পাল্টিয়ে গেল ।
                                                                Father and son

যাবার পথে এই রাস্তায় ( চলন্ত) গাড়ি থেকে এত এত ছবি তুলেছি বলার নই । তবু একটা ছবি গাড়ি থেকে নেমে কাছে গিয়ে না তোলার আফশোষ এখনও আছে । সুমি এই ছবিটা দেখো । ওদের ছোট পৃথিবী । মহিলার পিঠে একটা বাচ্চা । ওরা স্বামী স্ত্রী লাঙ্গল করছে । পাহাড় থেকে মেঘ নেমে এসেছে । কি অসাধারণ ল্যান্ড স্কেপ ছিল । এই সাত বছরে আমার প্রায় মনে পড়েছে এখানে একবার যাব । ভাবতাম আবার যেদিন যাব , সেদিন যদি মেঘ না নেমে আসে ? ওরা দুজন যদি সেদিন লাঙ্গল না দেয় । আর ভয় নেই সুমি । তুমি সাথে থাকবে এবার । এবার ওখানে নামব । গাড়ি চলে যায় যাবে । ওখানে রাত থাকব । মেঘ নামবে । বৃষ্টি হবে । মাঝ রাতে মেঘ ভেঙে চাঁদ দেখা দেবে । জান্নাত নেমে আসবে মাটির পৃথিবীতে ।
                                                                At Lava

আসুন এর এই সকালে ক্যামেরাটাকে আর খারাপ না করে লাভার বাকি গল্পটুকু করে নিই । আজকের মত সেদিন ডামডিম থেকে লাভা ওঠার শেষ ধাপগুলিও ছিল ভয়ংকর । সামনে থেকে এক গাড়ি দেখে মনে মনে ভাবছিলাম যে কোন সময় পাহাড়ে ধস নামতে পারে । আর গাড়ি সমেত -
                                                            Beautiful Lava

ভাবনাটা ভাবার কিছু সময়ের মধ্যেই দেখি গাড়ির জ্যাম । ড্রাইভার বলে দিলেন রাস্তায় ধস নেমেছে । গাড়ি থেকে নামলাম । রাস্তার ধস পরিষ্কার শুরু হয়েছে । কিছু পর রাস্তা কিছু পরিষ্কার করে গাড়ির যাতায়াত শুরু হল । ড্রাইভার জানালো এবার এই রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে । পুরো বর্ষাকাল বন্ধ থাকে । আমরা লাভা ঢুকলাম মেঘ কুয়াশার মধ্যে । অনেক গুলি কুয়াশার ছবি নিলাম চলন্ত গাড়ি থেকে । চলন্ত গাড়ি থেকে অল্প আলোয় ছবিগুলি খুব একটা ভাল হয় নি ।
                                                                    Beautiful Lava

লাভা আমরা ঘন্টা দেড় -দুই ছিলাম । আমাদের তাড়া ছিল কাল্মিপং যাওয়ার । ফের ওখান থেকে শিলিগুড়ি ফেরার । সন্ধ্যা সাতটায় কলকাতা ফেরার ট্রেন । একটা দিনের মধ্যে চালসা থেকে লাভা হয়ে শিলিগুড়ি ভায়া লোকাল গাড়ি , খুব সহজ ব্যাপার নই । সবটাই সম্ভব হয়েছিল সময়ে সময়ে গাড়ি পেয়ে যাওয়া ।

লাভা নিয়ে একটু বলে লেখা শেষ করব । লাভা খুব বড় জায়গা নই । কিন্ত অন্তত এক রাত দু দিন না থাকলে লাভার সৌন্দর্যকে উপভোগ করা যাবে না । লাভা থেকে চারিদিকে অনেক গুলি পয়েন্ট ঘোরার আছে । কিছু ছবি দিয়ে লেখা শেষ করছি । ছবিগুলি দেখে বুঝতে পারছি , আজ ভাঙা ক্যামেরা দিয়েও আরও ভাল ছবি তুলতে পারতাম । অনেক ছবি শুধু অভিজ্ঞতার অভাবে নষ্ট হয়েছে ।

Sk Munna