• Estuary of Teesta and Rangit Rivers

  • Teesta View Point

  • Chatakpur, Darjeeling

  • Chilapata Forest

Showing posts with label Chandipur. Show all posts
Showing posts with label Chandipur. Show all posts

Friday, December 6, 2019

চাঁদিপুর,পঞ্চলিঙ্গেশ্বর,কুলডিহা, বাংরিপোসি,সিমলিপাল - Chandipur, Panchalingeswar, Kuldiha, Bangriposi, Simlipal

আমিও একজন ভ্রমণ পাগল মানুষ।
এবার আমি এমন একটা ট্যুর প্ল্যান করতে চাইছিলাম, যেখানে একাধারে,
1. নির্জন সমুদ্র সৈকতের একাকীত্ব উপভোগ করতে পারবো,আবার ,
2. পাহাড়ের ঘ্রাণ নিতে পারবো,সেই সঙ্গে,
3. গভীর জঙ্গলের সবুজ চাদর গায়ে জড়িয়ে নিতে পারবো, আবার,
4. জলপ্রপাতের গর্জন শুনতে পারবো, তৎসহ,
5. নদী বাঁধের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবো,আর এর সাথে,
6. একটু ধর্মীয় কিছু স্থান ঘুরে দেখবো।

সিমলিপাল জঙ্গলের ম্যাপ
                                                            সিমলিপাল জঙ্গলের ম্যাপ

অনেক ভেবেচিন্তে এমন একটা ট্যুর প্ল্যান করে ফেললাম,যেখানে আমার সবকটি চাহিদাই পূরণ হবে। ঠিক করলাম আমার ট্যুর শুরু হবে,উড়িষ্যার চাঁদিপুর সমুদ্র সৈকত দিয়ে,


তারপর পঞ্চলিঙ্গেশ্বর হয়ে কুলডিহা ফরেস্ট,সিমলিপাল ফরেস্ট,আর বাংরিপোসি ঘুরবো।

চাহালা ওয়াচ টাওয়ার
                                                                    চাহালা ওয়াচ টাওয়ার

কিন্তু,সমস্যা হলো কবে যে উড়িষ্যা সরকার জঙ্গল সাফারী শুরু করার অনুমতি দেবেন, তা সঠিক ভাবে কেউই বলতে পারছিলো না।তবে খোঁজ খবর নিয়ে জানলাম,নিশ্চিত রূপে না হলেও, নভেম্বরের এক তারিখে জঙ্গল খুলে যাওয়ার একটা ক্ষীণ সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।তখন মনের নদীতে সাহসের নৌকা ভাসিয়ে দিয়ে, হোটেল বুক করে ফেললাম।এখানে একটা ব্যাপার উল্লেখ্য না করলেই নয়,যে,এই গ্রুপের অনেক পোস্ট ঘেঁটে আমি প্রচুর তথ্য পেয়েছিলাম,যা আমার ট্যুর সাজাতে ভীষণ সাহায্য করেছিলো।
                                                        ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ীর মেন গেট
প্রথম দিন (30.10.20) ::
ভোর ঠিক 5:20 তে গাড়ি স্টার্ট করে কোলাঘাট হয়ে,বালাসর হয়ে বেলা 10;30 এ'পৌঁছে গেলাম, চাঁদিপুর সমুদ্র সৈকতে অবস্থিত OTDC এর হোটেল, "পান্থনিবাসে"।গাড়ির ইঞ্জিনকে একটু বিশ্রাম দেওয়া, আর সেই অজুহাতে,বাড়ি থেকে রান্না করা খাবার দিয়ে,ব্রেকফাস্ট সেরে ফেলার কাজটা পথেই করে ফেলেছিলাম।

                         সিমলিপাল খইরি রিসর্ট এর মেন গেট থেকে সূর্যাস্তের সময় তোলা

পান্থনিবাস হোটেল, চাঁদিপুর সমুদ্র সৈকতের সেরা লোকেশনে অবস্থিত।খাবার দাবার যথেষ্ট ভালো।ঘর ভাড়া ন্যূনতম 1200 টাকা(কর অতিরিক্ত)।রুম অনলাইনে বুক করা যায়।
এখানকার সমুদ্রের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো,সমুদ্র প্রতিদিন 7km দূরে সরে যায়,আবার প্রতিদিনই ফিরে আসে।

                                                                বালাসরের ঈমামী জগন্নাথ মন্দির
বিকালবেলা টুক করে ঘুরে এলাম,পাশেই বুড়িবালাম নদীর মোহনা থেকে।এখানে জেলেদের মাছ ধরার বড় বড় কমলা-কালো নৌকা নোঙর করা আছে।জেলেদের বড় বড় জাল,শুটকি মাছ রৌদ্রে সান বাথ নেয়।ঝাউবনের ফাঁকে সমুদ্র উঁকি মারে।
                                                                    খুমকূট ড্যাম

সেইদিন পূর্ণিমা (তাও আবার ব্লু মুন ) হওয়ায় সমুদ্র, সন্ধ্যাবেলা থেকেই অসাধারণ রূপ ধারণ করলো,যা চোখ আর মনকে আনন্দে ভরিয়ে তুললো।


                                             নীলগিরি পাহাড়ের লাগোয়া,গোবিন্দ যাত্রী নিবাসের খোলা ছাদ
দ্বিতীয় দিন (31.10.20) ::
বেড়াতে গিয়ে বেলা অবধি ঘুমানো আমার ঠিক ভালো লাগে না।ভোরের স্নিগ্ধ বাতাসে, বালুকা বেলায় ছোট্ট একটা কোস্টাল ট্রেকিংয়ে বেরিয়ে শুধুই মনে হচ্ছিলো, প্রকৃতির কি অপরূপ লীলা!গতকাল রাতেই যে সমুদ্র রাগে গর্জন করছিলো, সে আজ ভোরের আলো ফোটার আগেই অভিমান করে চুপিসারে কোথায় চলে গেছে!!!সন্ধ্যায় যদি আজ সে, ফিরে না আসে?

                                                         যোশিপুর যাওয়ার পথ

সকাল সকাল স্নান সেরে যখন চেক আউট করলাম,তখন ঘড়িতে প্রায় আট টা বাজে ।আজ প্রথমেই যাবো,পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের আদলে তৈরি,বালাসরের ঈমামী জগন্নাথ মন্দির দেখতে।
এই মন্দির অত্যন্ত সুন্দর,পরিস্কার, ঝাঁ চকচকে।তবে প্রবেশের অনুমতি পেলেও কোভিডের কারণে পূজা দেবার অনুমতি পাওয়া গেলো না।

                                                            সিমলিপাল জঙ্গলের ভিতরে প্রবেশ করেই

এবার চললাম পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের উদ্দেশ্যে।আমরা আজ থাকবো, "গোবিন্দ যাত্রী নিবাসে"।হোটেলে ঢুকলাম 10 টা নাগাদ।আমার মতে এই হোটেলটি পঞ্চলিঙ্গেশ্বরের বেস্ট লোকেশন(পান্থনিবাসের থেকেও ভালো লোকেশন)।বিশেষ করে হোটেলের দোতলার ঘর আর সামনের খোলা ছাদ, যেখান থেকে নীলগিরি পাহাড় প্রায় হাত বাড়িয়েই ছুঁয়ে ফেলা যায়।হোটেলের খাওয়া ভালোই।ঘরের ভাড়াও বেশ কম।AC রুম 1000 থেকে 1200 টাকা।ফোনে যোগাযোগ করে ,50 পার্সেন্ট এডভান্স করে ,ঘর বুক করা যায়।

            340 বছর বয়সের তরুণ বৃক্ষ,যা সিমলিপাল জঙ্গলের মধ্যে প্রাচীনতম বলে মনে করা হয়(গাইড বলেছেন)

বিকালের রোদ কমে যাওয়ার আগেই চলে গেলাম,7km দূরে অবস্থিত খুমকূট ড্যাম দেখতে।যাওয়ার রাস্তাটি বেশ সরু হলেও,ওখানে পৌঁছে পাহাড়ের রূপ ,জলাধার আর ছোট ছোট আদিবাসী শিশুদের দেখে আমি মোহিত হয়ে পড়লাম।ওখান থেকে ফিরে হোটেলে গাড়ি পার্ক করে পায়ে হেঁটে চললাম পঞ্চলিঙ্গেশ্বর মন্দিরের পথে। জানতাম,কোভিডের কারণে মন্দিরে প্রবেশ নিষিদ্ধ, তবুও মন্দিরের সিঁড়ি অবধি ঐ চড়াই রাস্তাটুকু হাঁটতে আমার ভীষণ ভালো লাগে!



সৌভাগ্যবশতঃ আমাদের হোটেলের দোতলায় ঐ দিন আর কোনো বোর্ডার ছিলো না।এইকারণে আমরা সকলে মিলে, হোটেলের ঘরের সামনের বিশাল খোলা ছাদে বসে বসে পূর্ণিমার রাতে নীলগিরি পাহাড়ের রূপ উপভোগ করার সুযোগ পেয়ে গিয়েছিলাম।

                                                                        উস্কি জলপ্রপাত

তৃতীয় দিন (01.11.20) ::
সকাল সকাল স্নান সেরে ভারী ব্রেকফাস্ট খেয়ে চেক আউট করলাম, সকাল আটটা নাগাদ।আজ কুলডিহা ফরেস্ট খুলে যাওয়ার সম্ভাবনা আছে।গিয়ে যা দেখলাম,তা দেখে নিজের চোখকেও বিশ্বাস করতে পারলাম না।কুলডিহা ফরেস্টের মেন এন্ট্রি পয়েন্ট ফুল,বেলুন দিয়ে সাজানো হয়েছে,আর আজ একটু পরেই জঙ্গলের দরজা সাধারণ দর্শকদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে।আর দীর্ঘ কয়েকমাস পরে, আমরাই হবো প্রথম পর্যটক।

                                                                      বরেহিপানি জলপ্রপাত

গাড়ি থেকে নেমে,কুলডিহা ফরেস্ট গার্ডদের সঙ্গে কথা বলে জানতে পারলাম, এখানে জঙ্গল সাফারী করতে হলে নীলগিরিতে অবস্থিত ফরেস্ট অফিস থেকে পারমিট সংগ্রহ করে আনতে হবে।এখন পারমিট করতে আবার ফিরে যাওয়ার অর্থ হলো, প্রচুর সময় নষ্ট।অগত্যা, ওনাদের কাছে প্রবেশের অনুমতির জন্য অনুরোধ করে বসলাম।ওনারা বললেন,একজন আধিকারিক নীলগিরি থেকে এখনই বের হবেন,আমরা তথ্য দিলে উনি ফোন করে তাঁকে পারমিট নিয়ে আসতে বলবেন।আমরা যেন হাতে চাঁদ পেলাম।

                                                        সিমলিপালের যোশিপুর এন্ট্রি পয়েন্ট

যতক্ষন না আমাদের পারমিট চলে আসছে, ততক্ষণ,আমরা খুব কাছেই অবস্থিত, রিসিয়া ড্যাম ঘুরে দেখে আসতে পারি।আমরা চললাম রিসিয়া ড্যাম দেখতে।জঙ্গলের মধ্যে দিয়ে বন্ধুর,সরু,পাথুরে পথে যখন রিসিয়া ড্যাম পৌঁছালাম,তখন সূর্য মামা চোখ রাঙাতে শুরু করেছে।রিসিয়া ড্যাম দেখে চোখ জুড়িয়ে গেলো।দূরে পাহাড়ের সারি, আর সামনে বিপুল জলরাশি।তার পাশে লাল মাটির আঁকা বাঁকা পথ চলে গিয়েছে,মন কেমন করার দেশে।সে এক অদ্ভুত সৌন্দর্য!


গাড়ি ঘুরিয়ে দ্রুত কুলডিহা ফিরে এসে দেখি পারমিট রেডি।আধিকারিকরা আমাদের সকলকে চন্দনের ফোঁটা দিয়ে,ফুল দিয়ে স্বাগত জানালেন।ছিলো মিডিয়ার রিপোর্টাররা,আর গুটিকয়েক পর্যটক আর বন দপ্তরের আধিকারিকরা।
জঙ্গলে প্রবেশ করেই গেলাম,রিসিয়া নেচার ক্যাম্প।যেখানে টেন্টে,নিশিযাপনের সুন্দর ব্যবস্থা আছে।অনলাইনে বুক করে, এখানে রাতের জঙ্গলের স্বাদ চেখে দেখতে পারেন।
নিজেদের গাড়িতে জঙ্গল সাফারী করার মধ্যে একটা অদ্ভুত রোমাঞ্চকর, গা ছমছমে ব্যাপার আছে।আর দীর্ঘ কয়েকমাস জঙ্গল বন্ধ থাকায়,জঙ্গল যেন আরও বন্য রূপ ধারণ করেছিলো।শুকনো পাতার উপর দিয়ে যখন গাড়ির চাকা গড়িয়ে যাচ্ছিলো, তখন তার শব্দে এক অজানা ভয়ে শিহরিত হয়েছি বারেবারে।বিভিন্ন নাম না জানা পাখিরা,খুব মিষ্টি সুরে, আমাদের বন্ধু হওয়ার আমন্ত্রণ জানাচ্ছিলো।মাঝে এক জায়গায় একটা ওয়াচ টাওয়ার করা আছে।একটা ফরেস্ট অফিসও দেখলাম গভীর জঙ্গলে মাঝে। কোনো বড় পশুরা আমাদের দেখা দিতে রাজী হয়নি,তাই কিছুটা দুঃখ পেলেও,অসাধারন অভিজ্ঞতা নিয়ে একসময় সাফারী শেষ করে,জঙ্গল থেকে বেরিয়ে পড়লাম,বাংরিপোসির পথে।বাইরে আসার সময় ফরেস্ট গার্ডদের থেকে আরও একটা সুখবর জানতে পারলাম,ঐদিন সিমলিপাল জঙ্গলও পর্যটকদের জন্য খুলে দেওয়া হচ্ছে।
একটা কথা মনে রাখবেন, জঙ্গল সাফারিতে যাওয়ার পূর্বে,পর্যাপ্ত পানীয় জল অবশ্যই গাড়িতে রাখবেন।জঙ্গলে ধূমপান,মদ্যপান,পশুপাখিদের খাবার দেওয়া,বিরক্ত করা,হর্ন বাজানো,জোরে শব্দ করা,মাছ-মাংস খাওয়া,প্লাস্টিক ব্যবহার করা ইত্যাদি কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ।
যাওয়ার পথে দেবকুন্ড ঘুরে যাওয়ার ইচ্ছা ছিলো।কিন্তু,ঘড়ির কাঁটা বললো,দেবকুণ্ডের অনেকখানি হাঁটা পথ পেরিয়ে, আবার বাংরিপোসির হোটেলে পৌঁছাতে, অনেকটা দেরি হয়ে যাবে।ওদিকে দেবকুন্ড প্রবেশ করতে হলে দুপুর 3 টের আগেই প্রবেশ করতে হয়।তাই দেবকুন্ড যাওয়ার চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে হলো।পথে, একটা ভালো ধাবায় দেশি মুরগীর মাংস সহযোগে মধ্যাহ্নভোজন সেরে নিয়ে চলে এলাম,বাংরিপোসীর সেরা রিসর্ট ,"সিমলিপাল খইরি রিসর্টে"।
রিসর্টের একতলার AC ঘরের ভাড়া 1500 টাকা,নন AC ঘর 1000 টাকা।ফোনে কথা বলে অগ্রীম পাঠালে বুকিং হয়ে যায়।খাবার-দাবার অসাধারণ, রুম বেশ বড়,আর রিসর্টের পরিবেশ খুবই মনোরম। রিসর্টের ম্যানেজারের সাথে কথা বলে,পরের দিনের সিমলিপাল জঙ্গল সাফারী করার জন্য, একটা Bolero গাড়ি বুক করলাম।গাড়ি সকাল সাতটায় আসবে,আবার জঙ্গল সাফারী সেরে আমাদের হোটেলে পৌঁছে দেবে সন্ধ্যা 7 টায়,নেবে 4200 টাকা।এখানে দুটো প্রয়োজনীয় কথা বলা দরকার।প্রথমতঃ, গাড়ির গ্রাউন্ড ক্লিয়ারেন্স ভালো না হলে ,সিমলিপাল সাফারী করার অনুমতি পাওয়া যায় না।এখানে বড় গাড়ি (সুমো, বোলেরো, XUV)ছাড়া না যাওয়াই উচিত।
দ্বিতীয়ত,জঙ্গলে ঢোকার দুটি এন্ট্রি পয়েন্ট আছে,একটা বারিপাদা হয়ে ,আর অপরটি যোশিপুর হয়ে।আমরা যোশিপুর হয়েই যাবো ঠিক করলাম।
বাংরীপোসির আসে পাশে অনেক সুন্দর সুন্দর দেখার জায়গা আছে, যেমন,দেবকুন্ড জলপ্রপাত, সীতাকুন্ড,লুলুং নদী, পলপলা ড্যাম,শঙ্কারমারা ড্যাম,মা,দুয়ারসিনি মন্দির,সুলাইপাত ড্যাম,বাঁকিবল ড্যাম,বিসোই হাট,বুড়িবালাম নদী, ব্রাহ্মণকুন্ড,কান্দিহারা ঝরনা, বাদামঘাটি, নেদাম ড্যাম ইত্যাদি ইত্যাদি।যদিও এবার আমরা এগুলোর কোনোটাই ট্যুর প্ল্যানে রাখি নি।আমরা শুধুই সিমলিপাল জঙ্গল সাফারী করেই নিজেদের তৃপ্ত করবো,আর বাকি খিদেটা জমিয়ে রাখবো,পরের বারের জন্য।

চতুর্থ দিন (02.11.20) ::
ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠেই স্নান সেরে,ফ্রেশ হয়ে তৈরি হয়ে নিলাম।ভাড়া করা বোলেরো গাড়ি চেপে প্রথমে "বিসোই"তে এসে ব্রেকফাস্ট সারলাম।যোশিপুর এসেও ব্রেকফাস্ট করা যেতে পারে।চেষ্টা করবেন খুব ভোরে বেরিয়ে পড়তে।যোশিপুর থেকে ভোর 6am থেকে 9am পর্যন্ত জঙ্গল সাফারীর পারমিট ইস্যু করা হয়।এখান থেকে,শুধুমাত্র 35টি গাড়িকেই আগে আসার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে ছাড়পত্র দেওয়া হয়।(বারিপাদা থেকে 25 টি গাড়ির প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়।)
হোটেল থেকে বেরিয়েই পাহাড়ের চড়াই শুরু হয়েছিলো।পথে দেখলাম, হনুমানের দল সপরিবারে দল বেঁধে জনসভা বসিয়েছে।পথের ডানদিকে পড়বে মা দুয়ারসিনি মন্দির। পথের দুই ধারের শোভা অপরূপ।
যোশিপুর এসে পারমিট করিয়ে,গাইড বুক করে(গাইড 300 টাকা),জঙ্গলের ভিতরে লাঞ্চ বুক করার জন্য মাথাপিছু 100 টাকা,গাড়ির এবং জনপ্রতি ধার্য টাকা জমা করলাম।এখানে উল্লেখযোগ্য হলো,রেজিস্টার্ড গাইড ছাড়া জঙ্গলে প্রবেশ করা যায় না।আর পারমিটের জন্য আধার কার্ড প্রয়োজন হয়।
যাই হোক,এই সব কাজ সেরে,বৈধ ছাড়পত্র সংগ্রহ করে, আমরা চললাম জঙ্গলের ভিতরে।
সিমলিপাল জঙ্গল বিশাল এলাকা জুড়ে অবস্থিত।গাইডের কাছে জানতে পারলাম,একদিনে সিমলিপাল সম্পূর্ণ ঘুরে দেখা সম্ভব নয়।সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত,আমরা যা যা দেখবো তা সমগ্র সিমলিপালের একটা অংশ মাত্র।পুরো দেখতে হলে অন্ততঃ 3 দিন সাফারী করতেই হবে।
সিমলিপাল জঙ্গলের মধ্যেই বেশ কিছু গ্রাম আছে যেখানে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করেন।যদিও সরকার তাদের আর্থিক প্যাকেজ দিয়ে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করছেন।জঙ্গলের পথ বেশিভাগটাই পাহাড়ী।উঁচু উঁচু পাথুরে,পাহাড়ি পথ,মাঝে মাঝে উপত্যকা,কোথাও ছোট আদিবাসী গ্রাম,কোথাও বয়ে চলেছে নদী, ঝরণার ধারা।
জঙ্গল এক এক জায়গায় ,এক এক ধরণের।মোট কথায়, এখানে প্রকৃতিদেবী নিজের রূপচর্চায় কোনো ত্রুটি রাখেননি।এখানে দেখতে পাবেন,বেহেরিপানি জলপ্রপাত, যা ভারতবর্ষের দ্বিতীয় উচ্চতম জলপ্রপাত।উস্কি জলপ্রপাত, জোরান্ডা জলপ্রপাত,চাহালা ভিউ পয়েন্ট,লুলুং নদী, খইরি নদী ইত্যাদি।জঙ্গলে আছে,বিভিন্ন প্রজাতির হরিণ,হাতি,বাঘ,ময়ূর সহ বিভিন্ন পশু ও পাখি।
খইরি নদীর গা ঘেঁষে এগিয়ে গেলেই,এন্ট্রি পয়েন্ট।জঙ্গলে প্রবেশ করার একটু পরেই গাইড সাহেব গাড়ি দাঁড় করিয়ে নামতে বললেন।আমরা দেখলাম,সিমলিপাল জঙ্গলের সবথেকে প্রাচীন বৃদ্ধ সতেজ গাছটিকে।তাঁর মুখ থেকে শুনলাম গাছটি নিয়ে প্রচলিত কিছু মিথ,গল্প গাথা।
গাড়ি এগিয়ে চললো উপত্যকা,নদীর সাঁকো পেরিয়ে পাহাড়ি বন্য পথে।
এবার এলাম উস্কি জলপ্রপাত দেখতে।প্রবল জলরাশি অবিরাম ধারায় ঝরে পড়ছে পাথরের বুক চিরে,পাথরের বুকে।এ জলধারার কোনো বিরাম নেই,নেই কোন ক্লান্তি।শুধুই সময়ের স্রোতের মতই বয়ে যাওয়া,পিছিয়ে আসার অবকাশ নেই।
এরপর জঙ্গল,গ্রাম,আবার জঙ্গল,কখনো চড়াই পথে উপরে উঠছি,কখনো নীচে নেমেছি।আর হ্যাঁ, মাঝ পথে কিছু চাষের জমিও দেখেছি।এখানে বন্য জন্তু আর আদিবাসী মানুষ নিজেদের এলাকা যেন খুব সুন্দর দলিল পত্র করে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগী করে নিয়েছে।কেউ কাউকে অযথা হয়রানী করতে চায় না।
একজায়গায় এসে দেখি এখানেও বন দপ্তরের থাকার ব্যবস্থা (নেচার ক্যাম্প)আছে।এর ঠিক সামনেই আমাদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা রেডি হয়ে আছে।সকালে এন্ট্রি পয়েন্টে যখন লাঞ্চ বুক করেছিলাম,তখনই ওয়ারলেসের মাধ্যমে এখানে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিলো।যাক, গরম গরম ভাত,সুস্বাদু ডাল, সবজি,তরকারী, ভাজা,মিনারেল ওয়াটারের বোতল, আমাদের কাছে বেশ রাজকীয় মনে হলো।
এবার এগিয়ে চললাম,সুউচ্চ জলপ্রপাত(ভারতের দ্বিতীয় উচ্চতম)বরেহিপানি জলপ্রপাত দেখতে।উফফ্,এর সৌন্দর্য বর্ণনা করার ভাষা আমার জানা নেই।আমার মোবাইলের 48 মেগাপিক্সেল ক্যামেরায় এর রূপ বন্দী করা অসম্ভব।এটা এখানে এসে,নিজের চোখে দেখাই ভালো।মূল ভিউ পয়েন্ট থেকে সরে,জঙ্গলের এক জায়গায় নিয়ে গেলেন গাইড সাহেব।গিয়ে একটা অদ্ভুত জিনিস প্রত্যক্ষ করলাম।জলপ্রপাতের জলে সূর্যের আলো পড়ে, রামধনুর সৃষ্টি হয়েছে।যদিও আমার মোবাইলের দুর্বল zoom সেটাকে ফ্রেমবন্দি করতেই পারলো না।ওখান থেকে আসতেই ইচ্ছা করছিলো না।গাইড সাহেব একটা গাছে একটু ঝাঁকা দিতেই,ঝুপঝুপ করে কাঁচা আমলকী ঝরে পড়লো।কুড়িয়ে নিয়ে তার অম্ল মধুর স্বাদ চেখে দেখলাম।
এদিকে বেলা পড়ে আসছে।এরপর জোরান্ডা জলপ্রপাত দেখার পালা।গাইড সাহেব বললেন,জোরান্ডা আর কোর এরিয়ার বন্য জন্তু দেখা,এই দুটোর মধ্যে যেকোনো একটা বেছে নিতে।কারণ দুটো দুইদিকে,আর দূরত্ব অনেক।আমরা ঠিক করলাম,কোর এরিয়াতেই যাবো।সুতরাং গাড়ি ছুটলো,বন্য জন্তুদের আস্তানায়।

বরেহিপানি জলপ্রপাত দেখে একরাশ প্রশান্তি নিয়ে বেরিয়েছিলাম।বন্য জন্তু দেখার জন্য জঙ্গলের কোর এরিয়াতে প্রবেশ করতে হলো।দুই দিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে আমাদের গাড়ি চলছিলো, যতটা সম্ভব কম শব্দ করে।জঙ্গলের ভিতরে একটা ফরেস্ট গার্ডদের থাকার জায়গায় গিয়ে একটু দাঁড়ালাম।একটা পরিত্যক্ত ওয়াচ টাওয়ার মতো কিছু একটা ছিল,ওতেই ওঠার চেষ্টা করছিলাম।ওদের কাছে শুনলাম পূর্ণিমার রাতে বাঘ বেরিয়েছিলো।কিন্তু,বাঘের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি।আবার এগিয়ে চললাম।অনেকটা যাওয়ার পর কয়েকটি কালো মিশমিশে ,পাহাড় প্রমান হাতিকে জঙ্গলের মধ্যে ডালপালা ভাঙতে দেখলাম।যদিও গাড়িতে বসে বসে,ছবি ঠিক মতো তুলতে পারলাম না।খালি গাছপাতাই আসছিল ছবিতে,প্রাণীদের দেহের সামান্য অংশই দেখা যাচ্ছিলো, পুরো দেহকে ফ্রেমবন্দি করতে পারিনি একটি ছবিতেও।
এদিকে খুব তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা নেমে এসে আলিঙ্গন করছিলো সমগ্র জঙ্গলকে।আমরা দ্রুত পৌঁছালাম,চাহালা ওয়াচ পয়েন্টে।এখানে জঙ্গলের একটা অংশ পরিষ্কার করে,বিস্তীর্ণ তৃণভূমি করা হয়েছে,আর একটা Saltlick point করা হয়েছে।বন্যপ্রাণীরা সন্ধ্যায় এখানে চেটে চেটে শরীরের মিনারেল সংগ্রহ করতে আসে।দূরের আড়ালে থাকা ওয়াচ টাওয়ার থেকে তা দেখা যায়।আমরা একটু অপেক্ষা করলাম।একে একে, বাইসন জাতীয় কোনো প্রাণী আর পাল পাল হরিণ আসতে দেখলাম।কিন্তু,সেসব বেশ খানিকটা দূরে আর আলো কমে যাওয়ায় ছবি একদম ঝাপসা হয়ে গেলো।
সারাদিনের ভালো লাগার উপরে, অনেকটা জার্নির শারীরিক ধকল প্রভাব ফেলতে থাকলো।এদিকে ঝপ করে অন্ধকার নেমে এলো।আমরা জঙ্গল ছেড়ে,আসতে বাধ্য হলাম।গাড়ির হেড লাইট জ্বালিয়ে,শেষ এক্সিট পয়েন্ট পেরিয়ে যখন হাইরোডে উঠলাম,তখন গা ছমছমে ভাবটা কিছুটা কাটলেও সমগ্র শরীরে লেপ্টে ছিলো একরাশ ভালো লাগা। বাংরিপোসির খইরি রিসর্টে ফেরার পথে শুধুই চোখের সামনে ভাসছিলো, সারাদিন দেখা সমস্ত দৃশ্যগুলো।তখনই মনে মনে ভাবছিলাম,সিমলিপালে ভবিষ্যতে আবার আসতেই হবে।হোটেলে ফিরতে রাত আটটা বেজে গিয়েছিলো।এসেই ডিনার সেরে ঘুমিয়ে পড়ি।
পঞ্চম দিন (03.11.20):
পরেরদিন অর্থাৎ বাড়ি ফেরার দিন,ভোরবেলা উঠেই ঠিক করলাম,5am থেকে 8am এই তিন ঘন্টায় সুলাইপাত ড্যাম আর বাঁকিবল ড্যাম ঘুরে দেখবো।কিন্তু,শেষ মুহূর্তে মত বদলিয়ে ঘুরে এলাম কিছু,নাম না জানা আদিবাসী গ্রামে।যেখানে আদিবাসী গ্রামবাসীরা আড়মোড়া ভেঙে,দৈনন্দিন কাজে নিজেদের নিয়োজিত করতে শুরু করেছিল।
হোটেলে ফিরেই ঝট করে,স্নান আর ভারী ব্রেকফাস্ট সেরে নিয়ে,ঠিক 9টায় চেক আউট করলাম।
তবে এখনই বাড়ি ফিরতে মন চাইলো না।ঠিক করলাম একটু ঘুরে ঘুরে বাড়ি ফিরবো।গুগুল ম্যাপ ঘেঁটে প্রথমে হাতিবাড়ি,তারপর গোপীবল্লভপুর,এরপর লোধাশূলির জঙ্গল পেরিয়ে চলে গেলাম ঝাড়গ্রাম।ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ী দেখে,চলে গেলাম কনক দুর্গা মন্দির।এরপর গাড়ি মুম্বাই রোড ধরে এক ছুটে সোজা কোলাঘাটের শের-ই-পাঞ্জাব।এরপর একরাশ পেট পূজা সেরে,বাইরে বেরিয়ে একটা মিষ্টি পান চিবিয়ে সার্থক বাঙ্গালীবাবুর মতই বাড়ি ফিরলাম সন্ধ্যায়।।
কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য:
সিমলিপাল জঙ্গলে নাইট স্টে করার জন্য, বন বিভাগের 5টি ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় 5টি নেচার ক্যাম্প আছে,যা অনলাইনে বুক করা যায়।
বর্ষাকাল বন্যপ্রাণীদের মেটিং সিজিন,তাই বর্ষাকালে সমস্ত জঙ্গল পর্যটকদের জন্য বন্ধ থাকে।
দূরত্ব:
মোট 4 রাত,5 দিনের ট্যুরে আমরা প্রায় 1100 km মতো জার্নি করেছি।রাস্তা 95%মাখনের মতো মসৃন আর ফাঁকা।গুগুল ম্যাপের সাহায্য নিয়ে সব রাস্তার তথ্য পাবেন।তবুও,কিছু,বলি,
1.কলকাতা থেকে চাঁদিপুর বীচ প্রায় 260km
2.চাঁদিপুর থেকে পঞ্চলিঙ্গেশ্বর 39km
3.পঞ্চলিঙ্গেশ্বর থেকে খুমকূট ড্যাম 7km
4.পঞ্চলিঙ্গেশ্বর থেকে কুলডিহা ফরেস্ট এন্ট্রি 32km
5. কুলডিহা থেকে দেবকুন্ড 30km
6.বাংরিপোসি থেকে যোশিপুর 62km
ফোন নাম্বার:
১. গোবিন্দ যাত্রী নিবাস,পঞ্চলিঙ্গেশ্বর, নীলগিরি:
8895983671
8847849231
২. সিমলিপাল খইরি রিসর্ট,বাংরিপোসি,ময়ূরভঞ্জ:
09437877730
08249002656
06791223292
৩. OTDC এর পান্থনিবাস বুক করতে দেখুন:
৪. সিমলিপাল জঙ্গলের ভিতরের নেচার ক্যাম্পে থাকতে হলে,বুকিং করতে হবে নিচের ওয়েবসাইটে,
সকলে ভালো থাকুন,সুস্থ থাকুন।আর প্রচুর ভ্রমণ করুন।
ধন্যবাদ
সুমিত কুমার ঘোষ

Sunday, March 24, 2019

বালাসোর (বালেশ্বর) ও চাঁদিপুর - Balasore or Baleshwar and Chandipur

 এক লম্বা ড্রাইভে উড়িষ্যার বালেশ্বর ও চাঁদিপুরে:-

সেদিন হঠাৎ বসেছিলাম উড়িষ্যার ম্যাপ নিয়ে। ম্যাপ বলতে গুগলের ম্যাপ। আজকাল কোথাও যাবার কথা ভাবলেই প্রথমেই খুলে বসি, "গুগল ম্যাপ"। সেদিন ম্যাপে দেখতে বসেছিলাম, উড়িষ্যার বালাসোরের (বালেশ্বর) ও চাঁদিপুরের লোকেশন এবং যাবার রাস্তার যাবতীয় তথ্য। ইচ্ছে ছিল একটা লং ড্রাইভে যাওয়ার। কিন্তু শুধুমাত্র যাবার ইচ্ছে থাকলেই তো হয়না; কোথাও যাবার আগে সেই জায়গা এবং তার আশেপাশের দর্শনীয় জায়গাগুলোর আদ্যপান্ত জানার দরকার।
Sea beach, Chandipur
                                                        Sea beach, Chandipur

অবশ্য এই স্বভাব, আমার বহুবছরের, বোধহয় পেশাদারিত্বের তাগিদে। সেদিন চাঁদিপুর এবং তার আশেপাশের দর্শনীয় স্থানগুলোর বিস্তারিত বিবরণ দেখার পর, চাঁদিপুর সমুদ্র সৈকতের উপর, উড়িষ্যা ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের পান্থনিবাসে থাকাই মনস্থ করলাম। একেইতো চাঁদিপুরে সবচেয়ে ভালো লোকেশনে ওই পান্থনিবাস। তার উপরে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য ভাড়ায় একটা ছাড় রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে কম্প্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট। অবশ্য কম্প্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্টের চল, আজকাল ভারতের সমস্ত বাজেট এবং স্টার হোটেলগুলোতে চালু হয়েছে। অতএব একদিন ইন্টারনেটে উড়িষ্যা ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের ওয়েবসাইট থেকে পান্থনিবাসের একটা ঘরের বুকিং করে ফেললাম।

Concrete area of Panthanivas on the sea beach, Chandipur.
                                  Concrete area of Panthanivas on the sea beach, Chandipur

------ ২ ------
গত বছরের আঠেরোই জানুয়ারির (১৮-০১-২০১৯) সকালে, গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম উড়িষ্যার চাঁদিপুরের উদ্দেশ্যে। দক্ষিণেশ্বরের নিবেদিতা সেতুর টোলগেট পার করে উঠেছিলাম ষোলো নম্বর জাতীয় সড়কে। কোলাঘাট, ডেবরা পার হয়ে খড়গপুর চৌরঙ্গীমোড় থেকে তিন কিলোমিটার আগে, বাঁহাতে বাঁক নিয়েছে এন.এইচ.১৬। আবার ওই মোড় থেকে শুরু হয়েছে এন.এইচ ৪৯ যে রাস্তা ওখান থেকে শুরু হয়ে, লোধাশুলী, বাহারাগরা হয়ে কেওনঝড়ে গিয়েছে। এন.এইচ.১৬ ওই মোড় থেকে ডেবরা, দাঁতনের উপর দিয়ে, সোজা উড়িষ্যার জলেশ্বর পার হয়ে বালেশ্বরের উপর দিয়ে চলে গিয়েছে ভুবনেশ্বরের দিকে। একেবারে ঝাঁ-চকচকে রাস্তা। ট্রাফিক নেই বললেই চলে। এককথায় ড্রাইভিং করার স্বর্গ। আমি জলেশ্বরের টোলগেট পার হয়ে, সুবর্ণরেখা নদীর উপরের ব্রিজ পার করে এগিয়ে গেলাম বালেশ্বরের দিকে। বালেশ্বর শহরে ঢোকার চৌমাথার আগেই, রেলওয়ে ওভারব্রিজ পার হওয়ার পর, বাঁহাতে এগিয়ে চলেছে চাঁদিপুর যাবার রাস্তা। হাইওয়ে থেকে নীচে নেমে গেলাম, সার্ভিস রোড দিয়ে। ওটাই সবচেয়ে শর্টকাট রাস্তা, কলকাতা থেকে চাঁদিপুর যাবার জন্য। একটু এগোতেই পড়লো ইতিহাস প্রসিদ্ধ বুড়িবালাম নদীর সেতু। রাস্তা দেখলাম কখনও চলেছে বুড়িবালামের পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে, আবার কখনও টা- টা-বাই-বাই জানিয়ে অনেক দুরে। আমি বালেশ্বর শহরের অনেক আগে থেকেই চাঁদিপুর যাবার রাস্তা ধরেছিলাম। বালেশ্বর শহর থেকে প্রায় পনেরো কিলোমিটার দূরে চাঁদিপুর। লোকালয় ছাড়িয়ে কিছুটা চলার পর, রাস্তার দুধারে শুরু হলো অনুর্বর রুক্ষ জমি। তার মধ্যেই লাগানো হয়েছে নারকেল, খেজুর এবং কলাগাছ। তবে কিছু কিছু জায়গায় রাস্তার ধারে ইতস্তত করছিল কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়া গাছ । চাঁদিপুর সমুদ্র সৈকতে পৌঁছনোর বেশ কিছু আগেই শুরু হলো, রাস্তার ধারে পাঁচিলে ঘেরা কমপাউন্ড, শেষ আর হয়না। বুঝলাম ওটাই হলো চাঁদিপুরে অবস্থিত ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংগঠনের ( Defence Research and Development Organisation) কমপাউন্ড। অবশ্য ভারতের সমস্ত ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করা হয় আব্দুল কালাম দ্বীপ থেকে। দ্বীপটি চাঁদিপুর সমুদ্র উপকূল থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত।
The bank of Buribalam river.
                                                        The bank of Buribalam river

পান্থনিবাসে যাবার পথে বেশ কয়েকটি হোটেল দেখলাম সমুদ্র সৈকতের কাছেই; পাশাপাশি। দেখতে দেখতে পৌঁছলাম আমাদের গন্তব্যস্থল চাঁদিপুরের পান্থনিবাসে । দক্ষিণেশ্বরের নিবেদিতা সেতু থেকে ২৬১ কিলোমিটার। আমার বাড়ি থেকে ঠিক ২৬৪ কিলোমিটার। সকাল সাতটায় বেরিয়েছিলাম। পৌঁছাতে পৌঁছাতে ঘড়িতে বাজল দুপুর একটা‌। অবশ্য রাস্তায় বেশ কয়েকটি জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, চা, জলখাবারের জন্যে। পান্থনিবাসে পৌঁছে দেখলাম, কমপাউন্ডের চারিদিকে উচুঁ পাঁচিলে ঘেরা। প্রথমেই ঢোকার গেট। গেটের ভেতরে গাড়ি ঢোকানোর আগে, রিজার্ভেশনের কাগজ দেখতে চাইল। ভালই লাগল সুরক্ষার ব্যবস্থাপনা দেখে। এতটা ড্রাইভ করে আসার পর, পেটের ভিতরে ছুঁচোর ডন মারা শুরু হয়ে গিয়েছিল। রিসেপশনের ফর্ম্যালিটি মিটিয়ে, ওখানেই লাঞ্চের অর্ডার দিয়ে, আমাদের জন্য নির্দিষ্ট ঘরটি দখল করলাম; তারপর সোজা হোটেলের ডাইনিং হলে। হলটা বেশ বড়। একসঙ্গে তিরিশ চল্লিশজন লোকের খাবার খাওয়ানোর ব্যবস্থাপনা রয়েছে।
Nilgiri Palace
                                                                      Nilgiri Palace

------------ ৩ ----------
মধ্যাহ্ন ভোজন পর্ব শেষ করে, পান্থনিবাসের ভেতরে এক রাউন্ড চক্কর মারলাম দুজনে। বিশাল কমপাউন্ড; কিন্তু বাইরে থেকে বোঝাই যায়না। হোটেলের আকৃতিটা অদ্ভুত রকমের গোলাকার। আমি আমার জীবনে বিভিন্ন হোটেলে থেকেছি, কিন্তু এরকম গোল হোটেল আমি এর আগে কখনও দেখিনি । আমাদের ঘরটা দেখলাম সামনের দিকে। ঘর থেকেই সমুদ্র সৈকত দেখা যাচ্ছিল। ভেতরে আর একটা গোলাকৃতি কমপ্লেক্স। সেই কমপ্লেক্সের সামনে হোটেলের একটা বেশ বড় মাঠ আছে, যেখানে দোলনা, স্লিপ ইত্যাদি আছে। এমনকি ব্যাডমিন্টন খেলার কোর্ট। এছাড়া কিছু ফুলের গাছও আছে । নানান রকমের পাখি রয়েছে খাচায়। সবমিলিয়ে একটা শান্ত নিরিবিলি আর পরিচ্ছন্ন ভাব; যেটা একটা জায়গাকে ভাল লাগার জন্য যথেষ্ট উপযোগী। সবথেকে আকর্ষণীয় ব্যাপার হল সমুদ্রের নৈকট্য । ওই অংশে সমুদ্র সৈকতটা(sea beach) এবং ওখানকার বসার জায়গা ইত্যাদি, পান্থনিবাসের নিজস্ব, ওখানে বাইরের কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না ।
Durga Mandir, Adjacent to Nilgiri Palace
                                            Durga Mandir, Adjacent to Nilgiri Palace

হোটেল কমপাউন্ডের পরেই শুরু হয়েছে সৈকত। হোটেলের রিসেপশনের সামনে লনে নিজস্ব বাগান আর একটা ছোট্ট জলাশয় আছে, সেখানে আবার কচ্ছপ রয়েছে। সমস্ত দেখার পর, একটু বিশ্রাম নিয়ে গেলাম সমুদ্রের ধারে। কিন্তু কোথায় সমুদ্র ? দিগন্তরেখা পর্যন্ত যতদূর চোখ যায় শুধু বালি আর বালি ! সেই বালি কিন্তু নরম বালি নয়, শক্ত ভিজে বালি । হ্যাঁ, এটাই চাঁদিপুরের প্রধান আকর্ষণ । এখানে ভাঁটার সময়ে সমুদ্র, তীর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে চলে যায় । সমুদ্রতীর থেকে জলের রেখা দেখাও যায় না । জোয়ার ভাঁটার মধ্যে এই বিশাল পার্থক্যটা সারা ভারতবর্ষে একমাত্র গুজরাটের ভাবনগরের কলিয়াক সমুদ্র সৈকত ছাড়া আর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। ঘড়িতে দেখলাম বিকেল চারটে বেজেছে, সূর্য ক্রমশঃ দিগন্তের দিকে ঢলে পড়ছে, এর পরে আর বিচে হাঁটা যাবে না, তাই আমি জলের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। গিন্নি বেঞ্চের উপর বসে রইল।

Nilgiri Palace and Nilgiri Hill
                                                    Nilgiri Palace and Nilgiri Hill

কিন্তু পাঁচ কিলোমিটার শক্ত বালির ওপর হেঁটে চলা সহজ নয়, আর মাঝে মাঝে গোড়ালি ডোবানো জমা জল, কাজটাকে আরও কঠিন করে দেয়। প্রায় এক-দেড় কিলোমিটারের মতো এগিয়ে ফিরে এলাম । হোটেলের পাশেই সমুদ্রের সৈকত ধরে রয়েছে ঝাউবন; ওদিকে এগিয়ে গিয়ে দেখলাম, ঝাউ বনে হাওয়া ঢুকে খেলা করছে। সিমেন্টে বাঁধানো রাস্তার ঠিক নীচেই রয়েছে বালি। কয়েকটি কুচো বাচ্চা বালিতে নাম লিখছে, কিন্তু ঢেউ এসে মুছিয়ে দিচ্ছে না, অন্যান্য সমুদ্র সৈকতের মতো; কারন জল বা ঢেউ নেই ওখানে। একটু এগিয়েই বোল্ডার। চাঁদিপুরের সৈকতে খালি পায়ে হাঁটা যায় না। গোটা সৈকত জুড়েই ছড়িয়ে রয়েছে গুঁড়ো গুঁড়ো শামুক, ঝিনুক। মৃত রাজকাঁকড়ার খোলসও ছড়িয়ে রয়েছে ইতিউতি। আসলে এখনও মানুষ এসব জায়গায় পা রাখেনি তেমন। তাই ঝিনুক কুড়ানো যায় প্রাণ ভরে। হাঁটলেই পায়ের নীচে মড়মড় শব্দ তুলে গুঁড়িয়ে যায় ঝিনুক।

Foothill of Nilgiri( Pancha lingeswar)
                                                   Foothill of Nilgiri( Pancha lingeswar)

--------- ৪ ------------
সমুদ্রের তীরেই ঘোরাঘুরি করছিলাম দুজনে। কখনো পায়চারি, আবার কখনো একটু বসে জিরিয়ে নেওয়া। পান্থনিবাস একেবারে সমুদ্রের ধারেই। পান্থনিবাসের ঠিক সামনেই সমুদ্রের বিচের উপরে অনেকখানা জায়গা জুড়ে সাজানো রয়েছে বসার বেঞ্চ, কারুকাজ করা আলোকস্তম্ভ। লাইন দিয়ে রয়েছে হস্তশিল্পের দোকান, বিক্রি হচ্ছে চাউমিন এবং এগরোল। কিন্তু বাঁধানো বসার জায়গায় যা আলো আছে, তা সৈকতে পৌঁছায় না। অন্ধকার সমুদ্র, অনেক অনেক দূরে জেলেদের নৌকার টিমটিমে আলো। সমুদ্র এখানে গুটি গুটি পায়ে বেলাভূমিতে ফেনার নূপুর পরিয়ে যায়। একাই পায়চারি করছিলাম এদিক ওদিক। হটাৎ দেখি, গিন্নি সৈকতে নেমে বালির উপর ঝিনুকের খোঁজে ব্যস্ত। দেখে ভাবলাম, "ওই সাগরবেলায় ঝিনুক খোঁজার ছলে, আরও একবার নিজের শৈশবে হারিয়ে যাওয়ার ঠিকানা বোধহয় ওড়িশার চাঁদিপুর"।
Jagannath temple at Ispat colony, Balgopalpur, Balasore.
                                    Jagannath temple at Ispat colony, Balgopalpur, Balasore.

আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সূর্য অস্তাচলে যাবার জন্য তোড়জোড় শুরু করেছে। হটাৎ দেখি, ভীড় বাড়তে শুরু করেছে। বাইরের দিক থেকে পান্থনিবাসে ঢোকার প্রধান ফটকের পাশের ছোট্ট গেটটা দিয়ে, বাইরের লোক এসে, সমুদ্রের তীরে ভীড় জমিয়ে ফেলেছে। শুনলাম, বিকেল পাঁচটা থেকে জোয়ার শুরু হয়েছে। সন্ধ্যের পরেই সমুদ্রের জল তীর পর্যন্ত এসে যাবে। তাই এত ভীড়। অনেকেই সৈকতে নেমে জলের দিকে এগিয়ে চলেছে দেখলাম। আমিও হাঁটা শুরু করলাম ওদের পেছন পেছন। সত্যিই তাই। মাত্র দুশো মিটারও যেতে হলোনা, আধো অন্ধকারে দেখলাম সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে বেলাভূমিতে। দেখতে দেখতে চারিদিকে অন্ধকারের ঘনঘটা শুরু হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন একটু দুরুদুরু করা শুরু হয়েছিল, এই ভেবে যে সমুদ্রের জল যে কোনো মূহুর্তে আছড়ে পড়বে আমার উপর। আর দাঁড়িয়ে থাকলাম না, ঢেউয়ের আছড়ে পড়ার ওই দৃশ্য ক্যামেরা বন্দি করে দ্রুতগতিতে পা চালিয়ে দিলাম তীরের দিকে। রাতে ডিনারের পর আবার গিয়ে বসেছিলাম বীচের উপরে বেঞ্চের উপর কিছুক্ষণের জন্য। টিমটিমে আলো আর অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু ঢেউয়ের আওয়াজে বুঝতে পারলাম, সমুদ্রের জল তীরের কাছাকাছি এসে পৌঁছিয়েছে।
----------৫ -----------
পরদিন সকালে সূর্যোদয় দেখার সাথেই, সমুদ্রের সঙ্গে নিবিড় সখ্যতা তৈরি হয়ে গেল। তীরে জল ছিল না। কিন্তু সমস্ত রাত ধরে খেলা করে যাওয়া, জলের ঢেউয়ের ছাপ এবং জায়গায় জায়গায় জমে থাকা জল দেখে, বুঝতে কোনও অসুবিধা হলোনা, রাতে জলের উপস্থিতি উপলব্ধি করতে। সকালে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পরলাম চাঁদিপুরের আশেপাশে।চাঁদিপুর থেকে ঘণ্টাখানেকের দূরত্বেই বেশ কিছু ঘোরার জায়গা আছে। আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল বুড়িবালাম। পান্থনিবাস থেকে মাত্র দুই কিমি দূরে বুড়িবালাম নদীর তীর। স্থানীয় মানুষেরা চষাখণ্ড বলে থাকেন। ওখানেই বুড়িবালাম মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। ওইখানে অগ্নিযুগের বীর বিপ্লবী বাঘাযতীন, অস্ত্রবোঝাই মেভারিক জাহাজ ধরা পড়বার পরেও, চার্লস টেগার্টের ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে এক অসম লড়াইয়ে প্রাণ হারিয়ে, লুটিয়ে পড়েন এই বুড়িবালামের তীরে। কিন্তু ঠিক কোথায় ওই লড়াই হয়েছিল, তার সঠিক সন্ধান কেউ দিতে পারলো না। ওইখানে নদীর জেটিতে পরপর দাঁড়িয়ে ছিল, মাছ ধরার ট্রলার। পাশেই মাছের পাইকারি বাজার। শুনলাম উড়িষ্যা সরকার বিপ্লবী বাঘাযতীনের স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে, বুড়িবালামের তীরে একটি পার্ক তৈরি করে, বাঘাযতীনের মূর্তি স্থাপন করেছে। মনটা একটু ভারাক্রান্ত হয়ে গেল, অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের কথা ভেবে।
---------- ৬ --------
বুড়িবালামের তীরে কিছুক্ষণ কাটিয়ে দুজনে রওয়ানা দিলাম নীলগিরি রাজবাড়ির দিকে। বালেশ্বর শহরের উপর দিয়ে, রেলওয়ে লেভেল ক্রসিং পার করে সোজা উঠলাম ষোলো নম্বর জাতীয় সড়কে। ওই সড়ক ধরে, ভুবনেশ্বরের দিকে কিছুটা যাবার পর শুরু হয় সিমলিপাল ফরেস্টে যাবার রাস্তা। উনিশ নম্বর রাজ্য সড়ক। রাস্তার একদিকে পাহাড়। ওই পাহাড়ের গায়েই নীলগিরি প্রাসাদ। চাদিপুরের পান্থনিবাস থেকে দুরত্ব তেত্রিশ কিলোমিটার। নীলগিরি আসলে ব্রিটিশ আমলের প্রিন্সলে স্টেট। ১১২৫ সালে ছোটনাগপুরের কোনও এক রাজা এসে এখানে ভিত্তিস্থাপন করেন। রাজপুত ঘরানার লোকই ছিল এখানের বাসিন্দা। স্বাধীনতা সংগ্রামীরা এই প্রিন্সলে স্টেটটিকে রাজাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়। পরে ভারত স্বাধীন হলে নীলগিরি আলাদা শহর রূপে গড়ে ওঠে। এখন ভাঙাচোরা এককালের রাজপ্রাসাদ। জীর্ণ সিংহদুয়ার। দেওয়ালে রাজপুতানা চিত্রশিল্পের ভগ্নাবশেষ দেখে বোঝা যায়, এককালে দাপটে চলত রাজত্ব। একটা অংশে যত্নআত্তি করে রঙ করা। তাতে লেখা ‘নিজাগড় প্যালেস'। প্যালেসের কিছুটা অংশ মেরামত করে এখনকার রাজা থাকেন। আর কিছুটা ভাগে রয়েছে একটি স্কুল। প্যালেসের পাশেই একটি দূর্গা মন্দির। রাজবাড়ির পাশেই আছে নীলাগিরি পাহাড়, যেটার একেবারে ওপরে না হলেও অনেকদূর পর্যন্ত ট্রেকিং করে ওঠা যায় ।
---------- ৭ ----------
নিজাগড়(নীলগিরি) প্যালেস থেকে বেরিয়ে গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে এগিয়ে গেলাম, আট কিলোমিটার দূরের পঞ্চলিঙ্গেশ্বর মন্দিরের দিকে। নীলগিরি পাহাড়ের উপরের পঞ্চলিঙ্গেশ্বর মন্দির বোধহয় চাঁদিপুর/বালাসোরের অন্যতম আকর্ষণীয় ঘোরার জায়গা। নীলগিরি পাহাড় মন্দিরটিকে চারিদিক দিয়ে আচ্ছাদিত করে রেখেছে। তিনশো পাঁচটি সিঁড়ি পেরিয়ে পাহাড়ের উপরে, ভগবান শিবের পাঁচটি শিবলিঙ্গে জন্য পঞ্চলিঙ্গেশ্বর জনপ্রিয়। সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো, শিবের লিঙ্গের পাশেই প্রবহমন ঝর্ণার উপস্থিতি। যদিও তিনশো পাঁচটি সিঁড়ি পেরিয়ে পঞ্চলিঙ্গেশ্বরে পৌঁছাতে হয় কিন্তু বাস্তবিক ক্ষেত্রে দেখলাম, সিঁড়িগুলো দিয়ে উপরে উঠতে খুব বেশী কষ্ট হয় না। মন্দির বলতে অনেকটা পাহাড়ের গায়ে গুহার মতো। প্রচুর আলতা সিঁদুর লাগানো দেওয়াল, মাথায় ধর্মীয় পতাকা উড়ছে। পাঁচটা শিবলিঙ্গ রয়েছে জলের ধারার ঠিক পাশেই। ভক্তরা জলের ধারার জল মাথায় ছিটিয়ে পুজোয় বসছে। অবশ্য প্রতিটি শিবলিঙ্গের সামনে পুরোহিত রয়েছে, যারা পূজা করার জন্য সাহায্য করছে। সবচেয়ে যেটা ভালো লাগলো, তা হলো, ওঠার সিড়িগুলোর ধাপের সঙ্গেই বসার ব্যবস্থা, ফলে ওঠার ফাঁকে প্রয়োজনে একটু জিরিয়ে নেওয়া যেতে পারে। আমরা দুজন গল্প করতে করতে এবং প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে উপরে উঠছিলাম। কিছু কিছু জায়গায় চারিদিকের নৈসর্গিক দৃশ্য দেখে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছিল ।
-------- ৮ --------
পঞ্চলিঙ্গেশ্বর দেখার পর আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল রেমুনা।
পঞ্চলিঙ্গেশ্বর থেকে দুরত্ব ঠিক তিরিশ কিলোমিটার। কিন্তু অনেক বেলা হয়ে গিয়েছিল, পাহাড়ের উপর থেকে নীচে নামতে। ফলে লাঞ্চ করার জন্য একটা ভালো রেস্টুরেন্ট খুঁজে বের করতে অনেকটুকু সময় পার হয়ে গেল। যাইহোক শেষপর্যন্ত একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে মুখের ভিতর খাবার ঢুকিয়ে রেমুনার উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেলাম।
রেমুনায় বিখ্যাত "ক্ষীর চোরা গোপীনাথ" । কথিত আছে, চৈতন্য মহাপ্রভু এবং মাধবেন্দ্র পুরী, পুরীতে যাবার সময় রেমুনাতে বিশ্রাম নিয়ে পুরী যাত্রা করেন। নানান জনশ্রুতি রয়েছে চৈতন্য মহাপ্রভু এবং মাধবেন্দ্র পুরী এবং ক্ষীর চোরা গোপীনাথকে নিয়ে। বৈষ্ণব পদাবলী চৈতন্যদেব সম্পর্কে বলেছে, "রেমুণা তে গোপীনাথ পরমমোহন। ভক্তি করি কৈলা প্রভূ তাঁর দর্শন"। মন্দিরের গর্ভগৃহে রত্ন সিংহাসনে বসানো রয়েছে তিনটি কলেবর। মাঝখানে আছেন ক্ষীরচোরা গোপীনাথ, গোপীনাথের বাঁদিকে গোবিন্দ আর ডানদিকে মদনমোহন। শুনলাম মন্দিরে ভোরে মঙ্গলারতি থেকে রাত্রে বিশ্রাম অবধি ৮ বার আরতি হয়। বিখ্যাত ক্ষীরভোগ যাকে ‘অমৃতকেলি’ বলা হয় তা সন্ধ্যাবেলায় নিবেদন করা হয়। গোপীনাথ কে সপ্তাহে সাতদিনে সাত রঙের পোষাক পরানো হয়। দুপুরে নিবেদন করা হয় অন্নভোগ। ওই মন্দিরে শ্রী চৈতন্যদেবের পায়ের ছাপ রাখা আছে । ওখানকার সবথেকে বড় আকর্ষণ দেখলাম, সেটা হলো অত্যন্ত উৎকৃষ্ট মানের ক্ষীর। মন্দিরের ভেতরেই বিক্রি হচ্ছে; দামেও সস্তা। ২০ টাকা, ৩০ টাকা আর ৫০ টাকা। কিছু কিনে নেওয়া হলো, বাড়িতে নিয়ে আসার জন্য। মন্দির কমপ্লেক্সের ভিতরে নাটমন্দিরকে কেন্দ্র করে, দেওয়ালে খোদিত আছে কৃষ্ণ লীলার নানা ভার্স্কয্য। পুকুর পাড়ে রয়েছে এক আর্শ্চয্য অশ্বত্থ গাছ, যার পাতাগুলি অনেকটা ঠোঙার মত মোড়া। মাধবেন্দ্রপুরীর মঠ ও সমাধি দেখলাম রাস্তার পাশে। এখানেও একটা জগন্নাথের মন্দির দেখলাম ।
---------- ৯ ---------
রেমুনা থেকে সোজা এগিয়ে গেলাম বালগোপালপুরের জগন্নাথ মন্দিরের দিকে। রেমুনা থেকে দুরত্ব সাত কিলোমিটার। বালেশ্বরের বালগোপালপুরের এই মন্দিরটির কথা অনেকদিন ধরেই শুনেছিলাম। ইমামি গ্রুপ দ্বারা নির্মিত ও পরিচালিত এই মন্দিরটি পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের অবিকল প্রতিরুপ বলে দাবি করা হয়। তাই ওই মন্দিরটি দেখার ইচ্ছে ছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। যদিও মন্দিরটি বেশি দিনের নয়। ২০০৯ সালে মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু হয় এবং ২০১৫ সালে নভেম্বর মাসে মন্দিরটির উদ্বোধন হয়।
মন্দিরটা দেখার পর মনে হলো, এককথায় বলতে গেলে অপূর্ব। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের সঙ্গে তুলনা করার মতো ধৃষ্টতা আমার নেই। কিন্তু মন্দিরটি দেখার পর এর স্থাপত্যর প্রশংসা না করে থাকা যায় না। ১১.৭ মিটার উঁচু ওই মন্দিরে ষোলটি কোনারক চক্র আছে। দেখেই বুঝতে পারলাম খুব ভালভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। মন্দিরটির ছাদে ও দেয়ালে শ্রীকৃষ্ণের বাল্য লীলা, বিষ্ণুর দশাবতার এবং পুরাণের অনেক কিছু নিয়ে পট্টচিত্র আঁকা আছে। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের মতোই এখানেও ভোগের ব্যবস্থাপনা রয়েছে। সকালে ও সন্ধ্যায় আরতি হয়। মন্দিরটা দেখার পর ভাবলাম ওই মন্দিরটা না দেখলে, আমার চাঁদিপুর এবং বালেশ্বর ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যেতো। ওখানথেকেই সোজা পান্থনিবাস এলাম। ঠিক আঠাশ কিলোমিটারের ড্রাইভ। সন্ধ্যাবেলায় আবার গিয়ে বসলাম, সমুদ্র সৈকতে। পরেরদিন সকালে বেরিয়ে পড়লাম ফেরারপথে; তারসঙ্গে আবার একটা লম্বা ড্রাইভ।
***** আপনারাও ঘুরে আসুন। খুব ভালো লাগবে। নিজের গাড়ি না থাকলে, গাড়ি ভাড়া নিয়ে যেতে পারেন। অথবা ট্রেনে যেতে পারেন। অনেক ট্রেন আছে হাওড়া থেকে; কয়েকটির নাম দিলাম। ১) ফলকনামা এক্সপ্রেস। ২) ইস্ট কোস্ট এক্সপ্রেস। ৩) করমণ্ডল এক্সপ্রেস।৪) পুরী এক্সপ্রেস। ৫) জনশতাব্দীএক্সপ্রেস। ৬) ধৌলি এক্সপ্রেস। বালেশ্বর থেকে চাঁদিপুরের দূরত্ব ১৬ কিমি। বালাসোর স্টেশন থেকে গাড়ি ভাড়া করে চলে যেতে পারেন চাঁদিপুর থেকে, বালেশ্বরের আশেপাশের জায়গাগুলোতে।

Muktagopal Bhattacharyya