হোটেল থেকে বেরিয়েই পাহাড়ের চড়াই শুরু হয়েছিলো।পথে দেখলাম, হনুমানের দল সপরিবারে দল বেঁধে জনসভা বসিয়েছে।পথের ডানদিকে পড়বে মা দুয়ারসিনি মন্দির। পথের দুই ধারের শোভা অপরূপ।
যোশিপুর এসে পারমিট করিয়ে,গাইড বুক করে(গাইড 300 টাকা),জঙ্গলের ভিতরে লাঞ্চ বুক করার জন্য মাথাপিছু 100 টাকা,গাড়ির এবং জনপ্রতি ধার্য টাকা জমা করলাম।এখানে উল্লেখযোগ্য হলো,রেজিস্টার্ড গাইড ছাড়া জঙ্গলে প্রবেশ করা যায় না।আর পারমিটের জন্য আধার কার্ড প্রয়োজন হয়।
যাই হোক,এই সব কাজ সেরে,বৈধ ছাড়পত্র সংগ্রহ করে, আমরা চললাম জঙ্গলের ভিতরে।
সিমলিপাল জঙ্গল বিশাল এলাকা জুড়ে অবস্থিত।গাইডের কাছে জানতে পারলাম,একদিনে সিমলিপাল সম্পূর্ণ ঘুরে দেখা সম্ভব নয়।সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত,আমরা যা যা দেখবো তা সমগ্র সিমলিপালের একটা অংশ মাত্র।পুরো দেখতে হলে অন্ততঃ 3 দিন সাফারী করতেই হবে।
সিমলিপাল জঙ্গলের মধ্যেই বেশ কিছু গ্রাম আছে যেখানে আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করেন।যদিও সরকার তাদের আর্থিক প্যাকেজ দিয়ে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করছেন।জঙ্গলের পথ বেশিভাগটাই পাহাড়ী।উঁচু উঁচু পাথুরে,পাহাড়ি পথ,মাঝে মাঝে উপত্যকা,কোথাও ছোট আদিবাসী গ্রাম,কোথাও বয়ে চলেছে নদী, ঝরণার ধারা।
জঙ্গল এক এক জায়গায় ,এক এক ধরণের।মোট কথায়, এখানে প্রকৃতিদেবী নিজের রূপচর্চায় কোনো ত্রুটি রাখেননি।এখানে দেখতে পাবেন,বেহেরিপানি জলপ্রপাত, যা ভারতবর্ষের দ্বিতীয় উচ্চতম জলপ্রপাত।উস্কি জলপ্রপাত, জোরান্ডা জলপ্রপাত,চাহালা ভিউ পয়েন্ট,লুলুং নদী, খইরি নদী ইত্যাদি।জঙ্গলে আছে,বিভিন্ন প্রজাতির হরিণ,হাতি,বাঘ,ময়ূর সহ বিভিন্ন পশু ও পাখি।
খইরি নদীর গা ঘেঁষে এগিয়ে গেলেই,এন্ট্রি পয়েন্ট।জঙ্গলে প্রবেশ করার একটু পরেই গাইড সাহেব গাড়ি দাঁড় করিয়ে নামতে বললেন।আমরা দেখলাম,সিমলিপাল জঙ্গলের সবথেকে প্রাচীন বৃদ্ধ সতেজ গাছটিকে।তাঁর মুখ থেকে শুনলাম গাছটি নিয়ে প্রচলিত কিছু মিথ,গল্প গাথা।
গাড়ি এগিয়ে চললো উপত্যকা,নদীর সাঁকো পেরিয়ে পাহাড়ি বন্য পথে।
এবার এলাম উস্কি জলপ্রপাত দেখতে।প্রবল জলরাশি অবিরাম ধারায় ঝরে পড়ছে পাথরের বুক চিরে,পাথরের বুকে।এ জলধারার কোনো বিরাম নেই,নেই কোন ক্লান্তি।শুধুই সময়ের স্রোতের মতই বয়ে যাওয়া,পিছিয়ে আসার অবকাশ নেই।
এরপর জঙ্গল,গ্রাম,আবার জঙ্গল,কখনো চড়াই পথে উপরে উঠছি,কখনো নীচে নেমেছি।আর হ্যাঁ, মাঝ পথে কিছু চাষের জমিও দেখেছি।এখানে বন্য জন্তু আর আদিবাসী মানুষ নিজেদের এলাকা যেন খুব সুন্দর দলিল পত্র করে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগী করে নিয়েছে।কেউ কাউকে অযথা হয়রানী করতে চায় না।
একজায়গায় এসে দেখি এখানেও বন দপ্তরের থাকার ব্যবস্থা (নেচার ক্যাম্প)আছে।এর ঠিক সামনেই আমাদের দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা রেডি হয়ে আছে।সকালে এন্ট্রি পয়েন্টে যখন লাঞ্চ বুক করেছিলাম,তখনই ওয়ারলেসের মাধ্যমে এখানে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিলো।যাক, গরম গরম ভাত,সুস্বাদু ডাল, সবজি,তরকারী, ভাজা,মিনারেল ওয়াটারের বোতল, আমাদের কাছে বেশ রাজকীয় মনে হলো।
এবার এগিয়ে চললাম,সুউচ্চ জলপ্রপাত(ভারতের দ্বিতীয় উচ্চতম)বরেহিপানি জলপ্রপাত দেখতে।উফফ্,এর সৌন্দর্য বর্ণনা করার ভাষা আমার জানা নেই।আমার মোবাইলের 48 মেগাপিক্সেল ক্যামেরায় এর রূপ বন্দী করা অসম্ভব।এটা এখানে এসে,নিজের চোখে দেখাই ভালো।মূল ভিউ পয়েন্ট থেকে সরে,জঙ্গলের এক জায়গায় নিয়ে গেলেন গাইড সাহেব।গিয়ে একটা অদ্ভুত জিনিস প্রত্যক্ষ করলাম।জলপ্রপাতের জলে সূর্যের আলো পড়ে, রামধনুর সৃষ্টি হয়েছে।যদিও আমার মোবাইলের দুর্বল zoom সেটাকে ফ্রেমবন্দি করতেই পারলো না।ওখান থেকে আসতেই ইচ্ছা করছিলো না।গাইড সাহেব একটা গাছে একটু ঝাঁকা দিতেই,ঝুপঝুপ করে কাঁচা আমলকী ঝরে পড়লো।কুড়িয়ে নিয়ে তার অম্ল মধুর স্বাদ চেখে দেখলাম।
এদিকে বেলা পড়ে আসছে।এরপর জোরান্ডা জলপ্রপাত দেখার পালা।গাইড সাহেব বললেন,জোরান্ডা আর কোর এরিয়ার বন্য জন্তু দেখা,এই দুটোর মধ্যে যেকোনো একটা বেছে নিতে।কারণ দুটো দুইদিকে,আর দূরত্ব অনেক।আমরা ঠিক করলাম,কোর এরিয়াতেই যাবো।সুতরাং গাড়ি ছুটলো,বন্য জন্তুদের আস্তানায়।
বরেহিপানি জলপ্রপাত দেখে একরাশ প্রশান্তি নিয়ে বেরিয়েছিলাম।বন্য জন্তু দেখার জন্য জঙ্গলের কোর এরিয়াতে প্রবেশ করতে হলো।দুই দিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখে আমাদের গাড়ি চলছিলো, যতটা সম্ভব কম শব্দ করে।জঙ্গলের ভিতরে একটা ফরেস্ট গার্ডদের থাকার জায়গায় গিয়ে একটু দাঁড়ালাম।একটা পরিত্যক্ত ওয়াচ টাওয়ার মতো কিছু একটা ছিল,ওতেই ওঠার চেষ্টা করছিলাম।ওদের কাছে শুনলাম পূর্ণিমার রাতে বাঘ বেরিয়েছিলো।কিন্তু,বাঘের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার সৌভাগ্য আমাদের হয়নি।আবার এগিয়ে চললাম।অনেকটা যাওয়ার পর কয়েকটি কালো মিশমিশে ,পাহাড় প্রমান হাতিকে জঙ্গলের মধ্যে ডালপালা ভাঙতে দেখলাম।যদিও গাড়িতে বসে বসে,ছবি ঠিক মতো তুলতে পারলাম না।খালি গাছপাতাই আসছিল ছবিতে,প্রাণীদের দেহের সামান্য অংশই দেখা যাচ্ছিলো, পুরো দেহকে ফ্রেমবন্দি করতে পারিনি একটি ছবিতেও।
এদিকে খুব তাড়াতাড়ি সন্ধ্যা নেমে এসে আলিঙ্গন করছিলো সমগ্র জঙ্গলকে।আমরা দ্রুত পৌঁছালাম,চাহালা ওয়াচ পয়েন্টে।এখানে জঙ্গলের একটা অংশ পরিষ্কার করে,বিস্তীর্ণ তৃণভূমি করা হয়েছে,আর একটা Saltlick point করা হয়েছে।বন্যপ্রাণীরা সন্ধ্যায় এখানে চেটে চেটে শরীরের মিনারেল সংগ্রহ করতে আসে।দূরের আড়ালে থাকা ওয়াচ টাওয়ার থেকে তা দেখা যায়।আমরা একটু অপেক্ষা করলাম।একে একে, বাইসন জাতীয় কোনো প্রাণী আর পাল পাল হরিণ আসতে দেখলাম।কিন্তু,সেসব বেশ খানিকটা দূরে আর আলো কমে যাওয়ায় ছবি একদম ঝাপসা হয়ে গেলো।
সারাদিনের ভালো লাগার উপরে, অনেকটা জার্নির শারীরিক ধকল প্রভাব ফেলতে থাকলো।এদিকে ঝপ করে অন্ধকার নেমে এলো।আমরা জঙ্গল ছেড়ে,আসতে বাধ্য হলাম।গাড়ির হেড লাইট জ্বালিয়ে,শেষ এক্সিট পয়েন্ট পেরিয়ে যখন হাইরোডে উঠলাম,তখন গা ছমছমে ভাবটা কিছুটা কাটলেও সমগ্র শরীরে লেপ্টে ছিলো একরাশ ভালো লাগা। বাংরিপোসির খইরি রিসর্টে ফেরার পথে শুধুই চোখের সামনে ভাসছিলো, সারাদিন দেখা সমস্ত দৃশ্যগুলো।তখনই মনে মনে ভাবছিলাম,সিমলিপালে ভবিষ্যতে আবার আসতেই হবে।হোটেলে ফিরতে রাত আটটা বেজে গিয়েছিলো।এসেই ডিনার সেরে ঘুমিয়ে পড়ি।
পরেরদিন অর্থাৎ বাড়ি ফেরার দিন,ভোরবেলা উঠেই ঠিক করলাম,5am থেকে 8am এই তিন ঘন্টায় সুলাইপাত ড্যাম আর বাঁকিবল ড্যাম ঘুরে দেখবো।কিন্তু,শেষ মুহূর্তে মত বদলিয়ে ঘুরে এলাম কিছু,নাম না জানা আদিবাসী গ্রামে।যেখানে আদিবাসী গ্রামবাসীরা আড়মোড়া ভেঙে,দৈনন্দিন কাজে নিজেদের নিয়োজিত করতে শুরু করেছিল।
হোটেলে ফিরেই ঝট করে,স্নান আর ভারী ব্রেকফাস্ট সেরে নিয়ে,ঠিক 9টায় চেক আউট করলাম।
তবে এখনই বাড়ি ফিরতে মন চাইলো না।ঠিক করলাম একটু ঘুরে ঘুরে বাড়ি ফিরবো।গুগুল ম্যাপ ঘেঁটে প্রথমে হাতিবাড়ি,তারপর গোপীবল্লভপুর,এরপর লোধাশূলির জঙ্গল পেরিয়ে চলে গেলাম ঝাড়গ্রাম।ঝাড়গ্রাম রাজবাড়ী দেখে,চলে গেলাম কনক দুর্গা মন্দির।এরপর গাড়ি মুম্বাই রোড ধরে এক ছুটে সোজা কোলাঘাটের শের-ই-পাঞ্জাব।এরপর একরাশ পেট পূজা সেরে,বাইরে বেরিয়ে একটা মিষ্টি পান চিবিয়ে সার্থক বাঙ্গালীবাবুর মতই বাড়ি ফিরলাম সন্ধ্যায়।।
সিমলিপাল জঙ্গলে নাইট স্টে করার জন্য, বন বিভাগের 5টি ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় 5টি নেচার ক্যাম্প আছে,যা অনলাইনে বুক করা যায়।
বর্ষাকাল বন্যপ্রাণীদের মেটিং সিজিন,তাই বর্ষাকালে সমস্ত জঙ্গল পর্যটকদের জন্য বন্ধ থাকে।
দূরত্ব:
মোট 4 রাত,5 দিনের ট্যুরে আমরা প্রায় 1100 km মতো জার্নি করেছি।রাস্তা 95%মাখনের মতো মসৃন আর ফাঁকা।গুগুল ম্যাপের সাহায্য নিয়ে সব রাস্তার তথ্য পাবেন।তবুও,কিছু,বলি,
1.কলকাতা থেকে চাঁদিপুর বীচ প্রায় 260km
2.চাঁদিপুর থেকে পঞ্চলিঙ্গেশ্বর 39km
3.পঞ্চলিঙ্গেশ্বর থেকে খুমকূট ড্যাম 7km
4.পঞ্চলিঙ্গেশ্বর থেকে কুলডিহা ফরেস্ট এন্ট্রি 32km
5. কুলডিহা থেকে দেবকুন্ড 30km
6.বাংরিপোসি থেকে যোশিপুর 62km
ফোন নাম্বার:
১. গোবিন্দ যাত্রী নিবাস,পঞ্চলিঙ্গেশ্বর, নীলগিরি:
8895983671
8847849231
২. সিমলিপাল খইরি রিসর্ট,বাংরিপোসি,ময়ূরভঞ্জ:
09437877730
08249002656
06791223292
৩. OTDC এর পান্থনিবাস বুক করতে দেখুন:
৪. সিমলিপাল জঙ্গলের ভিতরের নেচার ক্যাম্পে থাকতে হলে,বুকিং করতে হবে নিচের ওয়েবসাইটে,
সকলে ভালো থাকুন,সুস্থ থাকুন।আর প্রচুর ভ্রমণ করুন।
ধন্যবাদ
সুমিত কুমার ঘোষ