• Estuary of Teesta and Rangit Rivers

  • Teesta View Point

  • Chatakpur, Darjeeling

  • Chilapata Forest

Sunday, March 24, 2019

বালাসোর (বালেশ্বর) ও চাঁদিপুর - Balasore or Baleshwar and Chandipur

 এক লম্বা ড্রাইভে উড়িষ্যার বালেশ্বর ও চাঁদিপুরে:-

সেদিন হঠাৎ বসেছিলাম উড়িষ্যার ম্যাপ নিয়ে। ম্যাপ বলতে গুগলের ম্যাপ। আজকাল কোথাও যাবার কথা ভাবলেই প্রথমেই খুলে বসি, "গুগল ম্যাপ"। সেদিন ম্যাপে দেখতে বসেছিলাম, উড়িষ্যার বালাসোরের (বালেশ্বর) ও চাঁদিপুরের লোকেশন এবং যাবার রাস্তার যাবতীয় তথ্য। ইচ্ছে ছিল একটা লং ড্রাইভে যাওয়ার। কিন্তু শুধুমাত্র যাবার ইচ্ছে থাকলেই তো হয়না; কোথাও যাবার আগে সেই জায়গা এবং তার আশেপাশের দর্শনীয় জায়গাগুলোর আদ্যপান্ত জানার দরকার।
Sea beach, Chandipur
                                                        Sea beach, Chandipur

অবশ্য এই স্বভাব, আমার বহুবছরের, বোধহয় পেশাদারিত্বের তাগিদে। সেদিন চাঁদিপুর এবং তার আশেপাশের দর্শনীয় স্থানগুলোর বিস্তারিত বিবরণ দেখার পর, চাঁদিপুর সমুদ্র সৈকতের উপর, উড়িষ্যা ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের পান্থনিবাসে থাকাই মনস্থ করলাম। একেইতো চাঁদিপুরে সবচেয়ে ভালো লোকেশনে ওই পান্থনিবাস। তার উপরে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য ভাড়ায় একটা ছাড় রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে কম্প্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট। অবশ্য কম্প্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্টের চল, আজকাল ভারতের সমস্ত বাজেট এবং স্টার হোটেলগুলোতে চালু হয়েছে। অতএব একদিন ইন্টারনেটে উড়িষ্যা ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের ওয়েবসাইট থেকে পান্থনিবাসের একটা ঘরের বুকিং করে ফেললাম।

Concrete area of Panthanivas on the sea beach, Chandipur.
                                  Concrete area of Panthanivas on the sea beach, Chandipur

------ ২ ------
গত বছরের আঠেরোই জানুয়ারির (১৮-০১-২০১৯) সকালে, গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম উড়িষ্যার চাঁদিপুরের উদ্দেশ্যে। দক্ষিণেশ্বরের নিবেদিতা সেতুর টোলগেট পার করে উঠেছিলাম ষোলো নম্বর জাতীয় সড়কে। কোলাঘাট, ডেবরা পার হয়ে খড়গপুর চৌরঙ্গীমোড় থেকে তিন কিলোমিটার আগে, বাঁহাতে বাঁক নিয়েছে এন.এইচ.১৬। আবার ওই মোড় থেকে শুরু হয়েছে এন.এইচ ৪৯ যে রাস্তা ওখান থেকে শুরু হয়ে, লোধাশুলী, বাহারাগরা হয়ে কেওনঝড়ে গিয়েছে। এন.এইচ.১৬ ওই মোড় থেকে ডেবরা, দাঁতনের উপর দিয়ে, সোজা উড়িষ্যার জলেশ্বর পার হয়ে বালেশ্বরের উপর দিয়ে চলে গিয়েছে ভুবনেশ্বরের দিকে। একেবারে ঝাঁ-চকচকে রাস্তা। ট্রাফিক নেই বললেই চলে। এককথায় ড্রাইভিং করার স্বর্গ। আমি জলেশ্বরের টোলগেট পার হয়ে, সুবর্ণরেখা নদীর উপরের ব্রিজ পার করে এগিয়ে গেলাম বালেশ্বরের দিকে। বালেশ্বর শহরে ঢোকার চৌমাথার আগেই, রেলওয়ে ওভারব্রিজ পার হওয়ার পর, বাঁহাতে এগিয়ে চলেছে চাঁদিপুর যাবার রাস্তা। হাইওয়ে থেকে নীচে নেমে গেলাম, সার্ভিস রোড দিয়ে। ওটাই সবচেয়ে শর্টকাট রাস্তা, কলকাতা থেকে চাঁদিপুর যাবার জন্য। একটু এগোতেই পড়লো ইতিহাস প্রসিদ্ধ বুড়িবালাম নদীর সেতু। রাস্তা দেখলাম কখনও চলেছে বুড়িবালামের পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে, আবার কখনও টা- টা-বাই-বাই জানিয়ে অনেক দুরে। আমি বালেশ্বর শহরের অনেক আগে থেকেই চাঁদিপুর যাবার রাস্তা ধরেছিলাম। বালেশ্বর শহর থেকে প্রায় পনেরো কিলোমিটার দূরে চাঁদিপুর। লোকালয় ছাড়িয়ে কিছুটা চলার পর, রাস্তার দুধারে শুরু হলো অনুর্বর রুক্ষ জমি। তার মধ্যেই লাগানো হয়েছে নারকেল, খেজুর এবং কলাগাছ। তবে কিছু কিছু জায়গায় রাস্তার ধারে ইতস্তত করছিল কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়া গাছ । চাঁদিপুর সমুদ্র সৈকতে পৌঁছনোর বেশ কিছু আগেই শুরু হলো, রাস্তার ধারে পাঁচিলে ঘেরা কমপাউন্ড, শেষ আর হয়না। বুঝলাম ওটাই হলো চাঁদিপুরে অবস্থিত ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংগঠনের ( Defence Research and Development Organisation) কমপাউন্ড। অবশ্য ভারতের সমস্ত ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করা হয় আব্দুল কালাম দ্বীপ থেকে। দ্বীপটি চাঁদিপুর সমুদ্র উপকূল থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত।
The bank of Buribalam river.
                                                        The bank of Buribalam river

পান্থনিবাসে যাবার পথে বেশ কয়েকটি হোটেল দেখলাম সমুদ্র সৈকতের কাছেই; পাশাপাশি। দেখতে দেখতে পৌঁছলাম আমাদের গন্তব্যস্থল চাঁদিপুরের পান্থনিবাসে । দক্ষিণেশ্বরের নিবেদিতা সেতু থেকে ২৬১ কিলোমিটার। আমার বাড়ি থেকে ঠিক ২৬৪ কিলোমিটার। সকাল সাতটায় বেরিয়েছিলাম। পৌঁছাতে পৌঁছাতে ঘড়িতে বাজল দুপুর একটা‌। অবশ্য রাস্তায় বেশ কয়েকটি জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, চা, জলখাবারের জন্যে। পান্থনিবাসে পৌঁছে দেখলাম, কমপাউন্ডের চারিদিকে উচুঁ পাঁচিলে ঘেরা। প্রথমেই ঢোকার গেট। গেটের ভেতরে গাড়ি ঢোকানোর আগে, রিজার্ভেশনের কাগজ দেখতে চাইল। ভালই লাগল সুরক্ষার ব্যবস্থাপনা দেখে। এতটা ড্রাইভ করে আসার পর, পেটের ভিতরে ছুঁচোর ডন মারা শুরু হয়ে গিয়েছিল। রিসেপশনের ফর্ম্যালিটি মিটিয়ে, ওখানেই লাঞ্চের অর্ডার দিয়ে, আমাদের জন্য নির্দিষ্ট ঘরটি দখল করলাম; তারপর সোজা হোটেলের ডাইনিং হলে। হলটা বেশ বড়। একসঙ্গে তিরিশ চল্লিশজন লোকের খাবার খাওয়ানোর ব্যবস্থাপনা রয়েছে।
Nilgiri Palace
                                                                      Nilgiri Palace

------------ ৩ ----------
মধ্যাহ্ন ভোজন পর্ব শেষ করে, পান্থনিবাসের ভেতরে এক রাউন্ড চক্কর মারলাম দুজনে। বিশাল কমপাউন্ড; কিন্তু বাইরে থেকে বোঝাই যায়না। হোটেলের আকৃতিটা অদ্ভুত রকমের গোলাকার। আমি আমার জীবনে বিভিন্ন হোটেলে থেকেছি, কিন্তু এরকম গোল হোটেল আমি এর আগে কখনও দেখিনি । আমাদের ঘরটা দেখলাম সামনের দিকে। ঘর থেকেই সমুদ্র সৈকত দেখা যাচ্ছিল। ভেতরে আর একটা গোলাকৃতি কমপ্লেক্স। সেই কমপ্লেক্সের সামনে হোটেলের একটা বেশ বড় মাঠ আছে, যেখানে দোলনা, স্লিপ ইত্যাদি আছে। এমনকি ব্যাডমিন্টন খেলার কোর্ট। এছাড়া কিছু ফুলের গাছও আছে । নানান রকমের পাখি রয়েছে খাচায়। সবমিলিয়ে একটা শান্ত নিরিবিলি আর পরিচ্ছন্ন ভাব; যেটা একটা জায়গাকে ভাল লাগার জন্য যথেষ্ট উপযোগী। সবথেকে আকর্ষণীয় ব্যাপার হল সমুদ্রের নৈকট্য । ওই অংশে সমুদ্র সৈকতটা(sea beach) এবং ওখানকার বসার জায়গা ইত্যাদি, পান্থনিবাসের নিজস্ব, ওখানে বাইরের কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না ।
Durga Mandir, Adjacent to Nilgiri Palace
                                            Durga Mandir, Adjacent to Nilgiri Palace

হোটেল কমপাউন্ডের পরেই শুরু হয়েছে সৈকত। হোটেলের রিসেপশনের সামনে লনে নিজস্ব বাগান আর একটা ছোট্ট জলাশয় আছে, সেখানে আবার কচ্ছপ রয়েছে। সমস্ত দেখার পর, একটু বিশ্রাম নিয়ে গেলাম সমুদ্রের ধারে। কিন্তু কোথায় সমুদ্র ? দিগন্তরেখা পর্যন্ত যতদূর চোখ যায় শুধু বালি আর বালি ! সেই বালি কিন্তু নরম বালি নয়, শক্ত ভিজে বালি । হ্যাঁ, এটাই চাঁদিপুরের প্রধান আকর্ষণ । এখানে ভাঁটার সময়ে সমুদ্র, তীর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে চলে যায় । সমুদ্রতীর থেকে জলের রেখা দেখাও যায় না । জোয়ার ভাঁটার মধ্যে এই বিশাল পার্থক্যটা সারা ভারতবর্ষে একমাত্র গুজরাটের ভাবনগরের কলিয়াক সমুদ্র সৈকত ছাড়া আর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। ঘড়িতে দেখলাম বিকেল চারটে বেজেছে, সূর্য ক্রমশঃ দিগন্তের দিকে ঢলে পড়ছে, এর পরে আর বিচে হাঁটা যাবে না, তাই আমি জলের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। গিন্নি বেঞ্চের উপর বসে রইল।

Nilgiri Palace and Nilgiri Hill
                                                    Nilgiri Palace and Nilgiri Hill

কিন্তু পাঁচ কিলোমিটার শক্ত বালির ওপর হেঁটে চলা সহজ নয়, আর মাঝে মাঝে গোড়ালি ডোবানো জমা জল, কাজটাকে আরও কঠিন করে দেয়। প্রায় এক-দেড় কিলোমিটারের মতো এগিয়ে ফিরে এলাম । হোটেলের পাশেই সমুদ্রের সৈকত ধরে রয়েছে ঝাউবন; ওদিকে এগিয়ে গিয়ে দেখলাম, ঝাউ বনে হাওয়া ঢুকে খেলা করছে। সিমেন্টে বাঁধানো রাস্তার ঠিক নীচেই রয়েছে বালি। কয়েকটি কুচো বাচ্চা বালিতে নাম লিখছে, কিন্তু ঢেউ এসে মুছিয়ে দিচ্ছে না, অন‍্যান‍্য সমুদ্র সৈকতের মতো; কারন জল বা ঢেউ নেই ওখানে। একটু এগিয়েই বোল্ডার। চাঁদিপুরের সৈকতে খালি পায়ে হাঁটা যায় না। গোটা সৈকত জুড়েই ছড়িয়ে রয়েছে গুঁড়ো গুঁড়ো শামুক, ঝিনুক। মৃত রাজকাঁকড়ার খোলসও ছড়িয়ে রয়েছে ইতিউতি। আসলে এখনও মানুষ এসব জায়গায় পা রাখেনি তেমন। তাই ঝিনুক কুড়ানো যায় প্রাণ ভরে। হাঁটলেই পায়ের নীচে মড়মড় শব্দ তুলে গুঁড়িয়ে যায় ঝিনুক।

Foothill of Nilgiri( Pancha lingeswar)
                                                   Foothill of Nilgiri( Pancha lingeswar)

--------- ৪ ------------
সমুদ্রের তীরেই ঘোরাঘুরি করছিলাম দুজনে। কখনো পায়চারি, আবার কখনো একটু বসে জিরিয়ে নেওয়া। পান্থনিবাস একেবারে সমুদ্রের ধারেই। পান্থনিবাসের ঠিক সামনেই সমুদ্রের বিচের উপরে অনেকখানা জায়গা জুড়ে সাজানো রয়েছে বসার বেঞ্চ, কারুকাজ করা আলোকস্তম্ভ। লাইন দিয়ে রয়েছে হস্তশিল্পের দোকান, বিক্রি হচ্ছে চাউমিন এবং এগরোল। কিন্তু বাঁধানো বসার জায়গায় যা আলো আছে, তা সৈকতে পৌঁছায় না। অন্ধকার সমুদ্র, অনেক অনেক দূরে জেলেদের নৌকার টিমটিমে আলো। সমুদ্র এখানে গুটি গুটি পায়ে বেলাভূমিতে ফেনার নূপুর পরিয়ে যায়। একাই পায়চারি করছিলাম এদিক ওদিক। হটাৎ দেখি, গিন্নি সৈকতে নেমে বালির উপর ঝিনুকের খোঁজে ব‍্যস্ত। দেখে ভাবলাম, "ওই সাগরবেলায় ঝিনুক খোঁজার ছলে, আরও একবার নিজের শৈশবে হারিয়ে যাওয়ার ঠিকানা বোধহয় ওড়িশার চাঁদিপুর"।
Jagannath temple at Ispat colony, Balgopalpur, Balasore.
                                    Jagannath temple at Ispat colony, Balgopalpur, Balasore.

আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সূর্য অস্তাচলে যাবার জন্য তোড়জোড় শুরু করেছে। হটাৎ দেখি, ভীড় বাড়তে শুরু করেছে। বাইরের দিক থেকে পান্থনিবাসে ঢোকার প্রধান ফটকের পাশের ছোট্ট গেটটা দিয়ে, বাইরের লোক এসে, সমুদ্রের তীরে ভীড় জমিয়ে ফেলেছে। শুনলাম, বিকেল পাঁচটা থেকে জোয়ার শুরু হয়েছে। সন্ধ্যের পরেই সমুদ্রের জল তীর পর্যন্ত এসে যাবে। তাই এত ভীড়। অনেকেই সৈকতে নেমে জলের দিকে এগিয়ে চলেছে দেখলাম। আমিও হাঁটা শুরু করলাম ওদের পেছন পেছন। সত্যিই তাই। মাত্র দুশো মিটারও যেতে হলোনা, আধো অন্ধকারে দেখলাম সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে বেলাভূমিতে। দেখতে দেখতে চারিদিকে অন্ধকারের ঘনঘটা শুরু হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন একটু দুরুদুরু করা শুরু হয়েছিল, এই ভেবে যে সমুদ্রের জল যে কোনো মূহুর্তে আছড়ে পড়বে আমার উপর। আর দাঁড়িয়ে থাকলাম না, ঢেউয়ের আছড়ে পড়ার ওই দৃশ্য ক্যামেরা বন্দি করে দ্রুতগতিতে পা চালিয়ে দিলাম তীরের দিকে। রাতে ডিনারের পর আবার গিয়ে বসেছিলাম বীচের উপরে বেঞ্চের উপর কিছুক্ষণের জন্য। টিমটিমে আলো আর অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু ঢেউয়ের আওয়াজে বুঝতে পারলাম, সমুদ্রের জল তীরের কাছাকাছি এসে পৌঁছিয়েছে।
----------৫ -----------
পরদিন সকালে সূর্যোদয় দেখার সাথেই, সমুদ্রের সঙ্গে নিবিড় সখ্যতা তৈরি হয়ে গেল। তীরে জল ছিল না। কিন্তু সমস্ত রাত ধরে খেলা করে যাওয়া, জলের ঢেউয়ের ছাপ এবং জায়গায় জায়গায় জমে থাকা জল দেখে, বুঝতে কোনও অসুবিধা হলোনা, রাতে জলের উপস্থিতি উপলব্ধি করতে। সকালে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পরলাম চাঁদিপুরের আশেপাশে।চাঁদিপুর থেকে ঘণ্টাখানেকের দূরত্বেই বেশ কিছু ঘোরার জায়গা আছে। আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল বুড়িবালাম। পান্থনিবাস থেকে মাত্র দুই কিমি দূরে বুড়িবালাম নদীর তীর। স্থানীয় মানুষেরা চষাখণ্ড বলে থাকেন। ওখানেই বুড়িবালাম মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। ওইখানে অগ্নিযুগের বীর বিপ্লবী বাঘাযতীন, অস্ত্রবোঝাই মেভারিক জাহাজ ধরা পড়বার পরেও, চার্লস টেগার্টের ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে এক অসম লড়াইয়ে প্রাণ হারিয়ে, লুটিয়ে পড়েন এই বুড়িবালামের তীরে। কিন্তু ঠিক কোথায় ওই লড়াই হয়েছিল, তার সঠিক সন্ধান কেউ দিতে পারলো না। ওইখানে নদীর জেটিতে পরপর দাঁড়িয়ে ছিল, মাছ ধরার ট্রলার। পাশেই মাছের পাইকারি বাজার। শুনলাম উড়িষ্যা সরকার বিপ্লবী বাঘাযতীনের স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে, বুড়িবালামের তীরে একটি পার্ক তৈরি করে, বাঘাযতীনের মূর্তি স্থাপন করেছে। মনটা একটু ভারাক্রান্ত হয়ে গেল, অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের কথা ভেবে।
---------- ৬ --------
বুড়িবালামের তীরে কিছুক্ষণ কাটিয়ে দুজনে রওয়ানা দিলাম নীলগিরি রাজবাড়ির দিকে। বালেশ্বর শহরের উপর দিয়ে, রেলওয়ে লেভেল ক্রসিং পার করে সোজা উঠলাম ষোলো নম্বর জাতীয় সড়কে। ওই সড়ক ধরে, ভুবনেশ্বরের দিকে কিছুটা যাবার পর শুরু হয় সিমলিপাল ফরেস্টে যাবার রাস্তা। উনিশ নম্বর রাজ‍্য সড়ক। রাস্তার একদিকে পাহাড়। ওই পাহাড়ের গায়েই নীলগিরি প্রাসাদ। চাদিপুরের পান্থনিবাস থেকে দুরত্ব তেত্রিশ কিলোমিটার। নীলগিরি আসলে ব্রিটিশ আমলের প্রিন্সলে স্টেট। ১১২৫ সালে ছোটনাগপুরের কোনও এক রাজা এসে এখানে ভিত্তিস্থাপন করেন। রাজপুত ঘরানার লোকই ছিল এখানের বাসিন্দা। স্বাধীনতা সংগ্রামীরা এই প্রিন্সলে স্টেটটিকে রাজাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়। পরে ভারত স্বাধীন হলে নীলগিরি আলাদা শহর রূপে গড়ে ওঠে। এখন ভাঙাচোরা এককালের রাজপ্রাসাদ। জীর্ণ সিংহদুয়ার। দেওয়ালে রাজপুতানা চিত্রশিল্পের ভগ্নাবশেষ দেখে বোঝা যায়, এককালে দাপটে চলত রাজত্ব। একটা অংশে যত্নআত্তি করে রঙ করা। তাতে লেখা ‘নিজাগড় প্যালেস'। প‍্যালেসের কিছুটা অংশ মেরামত করে এখনকার রাজা থাকেন। আর কিছুটা ভাগে রয়েছে একটি স্কুল। প‍্যালেসের পাশেই একটি দূর্গা মন্দির। রাজবাড়ির পাশেই আছে নীলাগিরি পাহাড়, যেটার একেবারে ওপরে না হলেও অনেকদূর পর্যন্ত ট্রেকিং করে ওঠা যায় ।
---------- ৭ ----------
নিজাগড়(নীলগিরি) প্যালেস থেকে বেরিয়ে গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে এগিয়ে গেলাম, আট কিলোমিটার দূরের পঞ্চলিঙ্গেশ্বর মন্দিরের দিকে। নীলগিরি পাহাড়ের উপরের পঞ্চলিঙ্গেশ্বর মন্দির বোধহয় চাঁদিপুর/বালাসোরের অন্যতম আকর্ষণীয় ঘোরার জায়গা। নীলগিরি পাহাড় মন্দিরটিকে চারিদিক দিয়ে আচ্ছাদিত করে রেখেছে। তিনশো পাঁচটি সিঁড়ি পেরিয়ে পাহাড়ের উপরে, ভগবান শিবের পাঁচটি শিবলিঙ্গে জন্য পঞ্চলিঙ্গেশ্বর জনপ্রিয়। সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো, শিবের লিঙ্গের পাশেই প্রবহমন ঝর্ণার উপস্থিতি। যদিও তিনশো পাঁচটি সিঁড়ি পেরিয়ে পঞ্চলিঙ্গেশ্বরে পৌঁছাতে হয় কিন্তু বাস্তবিক ক্ষেত্রে দেখলাম, সিঁড়িগুলো দিয়ে উপরে উঠতে খুব বেশী কষ্ট হয় না। মন্দির বলতে অনেকটা পাহাড়ের গায়ে গুহার মতো। প্রচুর আলতা সিঁদুর লাগানো দেওয়াল, মাথায় ধর্মীয় পতাকা উড়ছে। পাঁচটা শিবলিঙ্গ রয়েছে জলের ধারার ঠিক পাশেই। ভক্তরা জলের ধারার জল মাথায় ছিটিয়ে পুজোয় বসছে। অবশ্য প্রতিটি শিবলিঙ্গের সামনে পুরোহিত রয়েছে, যারা পূজা করার জন্য সাহায্য করছে। সবচেয়ে যেটা ভালো লাগলো, তা হলো, ওঠার সিড়িগুলোর ধাপের সঙ্গেই বসার ব্যবস্থা, ফলে ওঠার ফাঁকে প্রয়োজনে একটু জিরিয়ে নেওয়া যেতে পারে। আমরা দুজন গল্প করতে করতে এবং প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে উপরে উঠছিলাম। কিছু কিছু জায়গায় চারিদিকের নৈসর্গিক দৃশ্য দেখে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছিল ।
-------- ৮ --------
পঞ্চলিঙ্গেশ্বর দেখার পর আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল রেমুনা।
পঞ্চলিঙ্গেশ্বর থেকে দুরত্ব ঠিক তিরিশ কিলোমিটার। কিন্তু অনেক বেলা হয়ে গিয়েছিল, পাহাড়ের উপর থেকে নীচে নামতে। ফলে লাঞ্চ করার জন্য একটা ভালো রেস্টুরেন্ট খুঁজে বের করতে অনেকটুকু সময় পার হয়ে গেল। যাইহোক শেষপর্যন্ত একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে মুখের ভিতর খাবার ঢুকিয়ে রেমুনার উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেলাম।
রেমুনায় বিখ্যাত "ক্ষীর চোরা গোপীনাথ" । কথিত আছে, চৈতন্য মহাপ্রভু এবং মাধবেন্দ্র পুরী, পুরীতে যাবার সময় রেমুনাতে বিশ্রাম নিয়ে পুরী যাত্রা করেন। নানান জনশ্রুতি রয়েছে চৈতন্য মহাপ্রভু এবং মাধবেন্দ্র পুরী এবং ক্ষীর চোরা গোপীনাথকে নিয়ে। বৈষ্ণব পদাবলী চৈতন্যদেব সম্পর্কে বলেছে, "রেমুণা তে গোপীনাথ পরমমোহন। ভক্তি করি কৈলা প্রভূ তাঁর দর্শন"। মন্দিরের গর্ভগৃহে রত্ন সিংহাসনে বসানো রয়েছে তিনটি কলেবর। মাঝখানে আছেন ক্ষীরচোরা গোপীনাথ, গোপীনাথের বাঁদিকে গোবিন্দ আর ডানদিকে মদনমোহন। শুনলাম মন্দিরে ভোরে মঙ্গলারতি থেকে রাত্রে বিশ্রাম অবধি ৮ বার আরতি হয়। বিখ্যাত ক্ষীরভোগ যাকে ‘অমৃতকেলি’ বলা হয় তা সন্ধ্যাবেলায় নিবেদন করা হয়। গোপীনাথ কে সপ্তাহে সাতদিনে সাত রঙের পোষাক পরানো হয়। দুপুরে নিবেদন করা হয় অন্নভোগ। ওই মন্দিরে শ্রী চৈতন্যদেবের পায়ের ছাপ রাখা আছে । ওখানকার সবথেকে বড় আকর্ষণ দেখলাম, সেটা হলো অত্যন্ত উৎকৃষ্ট মানের ক্ষীর। মন্দিরের ভেতরেই বিক্রি হচ্ছে; দামেও সস্তা। ২০ টাকা, ৩০ টাকা আর ৫০ টাকা। কিছু কিনে নেওয়া হলো, বাড়িতে নিয়ে আসার জন্য। মন্দির কমপ্লেক্সের ভিতরে নাটমন্দিরকে কেন্দ্র করে, দেওয়ালে খোদিত আছে কৃষ্ণ লীলার নানা ভার্স্কয্য। পুকুর পাড়ে রয়েছে এক আর্শ্চয্য অশ্বত্থ গাছ, যার পাতাগুলি অনেকটা ঠোঙার মত মোড়া। মাধবেন্দ্রপুরীর মঠ ও সমাধি দেখলাম রাস্তার পাশে। এখানেও একটা জগন্নাথের মন্দির দেখলাম ।
---------- ৯ ---------
রেমুনা থেকে সোজা এগিয়ে গেলাম বালগোপালপুরের জগন্নাথ মন্দিরের দিকে। রেমুনা থেকে দুরত্ব সাত কিলোমিটার। বালেশ্বরের বালগোপালপুরের এই মন্দিরটির কথা অনেকদিন ধরেই শুনেছিলাম। ইমামি গ্রুপ দ্বারা নির্মিত ও পরিচালিত এই মন্দিরটি পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের অবিকল প্রতিরুপ বলে দাবি করা হয়। তাই ওই মন্দিরটি দেখার ইচ্ছে ছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। যদিও মন্দিরটি বেশি দিনের নয়। ২০০৯ সালে মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু হয় এবং ২০১৫ সালে নভেম্বর মাসে মন্দিরটির উদ্বোধন হয়।
মন্দিরটা দেখার পর মনে হলো, এককথায় বলতে গেলে অপূর্ব। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের সঙ্গে তুলনা করার মতো ধৃষ্টতা আমার নেই। কিন্তু মন্দিরটি দেখার পর এর স্থাপত্যর প্রশংসা না করে থাকা যায় না। ১১.৭ মিটার উঁচু ওই মন্দিরে ষোলটি কোনারক চক্র আছে। দেখেই বুঝতে পারলাম খুব ভালভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। মন্দিরটির ছাদে ও দেয়ালে শ্রীকৃষ্ণের বাল্য লীলা, বিষ্ণুর দশাবতার এবং পুরাণের অনেক কিছু নিয়ে পট্টচিত্র আঁকা আছে। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের মতোই এখানেও ভোগের ব্যবস্থাপনা রয়েছে। সকালে ও সন্ধ্যায় আরতি হয়। মন্দিরটা দেখার পর ভাবলাম ওই মন্দিরটা না দেখলে, আমার চাঁদিপুর এবং বালেশ্বর ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যেতো। ওখানথেকেই সোজা পান্থনিবাস এলাম। ঠিক আঠাশ কিলোমিটারের ড্রাইভ। সন্ধ্যাবেলায় আবার গিয়ে বসলাম, সমুদ্র সৈকতে। পরেরদিন সকালে বেরিয়ে পড়লাম ফেরারপথে; তারসঙ্গে আবার একটা লম্বা ড্রাইভ।
***** আপনারাও ঘুরে আসুন। খুব ভালো লাগবে। নিজের গাড়ি না থাকলে, গাড়ি ভাড়া নিয়ে যেতে পারেন। অথবা ট্রেনে যেতে পারেন। অনেক ট্রেন আছে হাওড়া থেকে; কয়েকটির নাম দিলাম। ১) ফলকনামা এক্সপ্রেস। ২) ইস্ট কোস্ট এক্সপ্রেস। ৩) করমণ্ডল এক্সপ্রেস।৪) পুরী এক্সপ্রেস। ৫) জনশতাব্দীএক্সপ্রেস। ৬) ধৌলি এক্সপ্রেস। বালেশ্বর থেকে চাঁদিপুরের দূরত্ব ১৬ কিমি। বালাসোর স্টেশন থেকে গাড়ি ভাড়া করে চলে যেতে পারেন চাঁদিপুর থেকে, বালেশ্বরের আশেপাশের জায়গাগুলোতে।

Muktagopal Bhattacharyya

Sunday, March 10, 2019

দেউলটি (হাওড়া) - Deulti(Howrah)

 দেউলটিতে কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি ও বর্ষায় রূপনারায়ন নদীর রুপ দেখা ঃ

০৩ - ০৮ - ২০১৮
এক বর্ষার দিনে বেড়িয়ে পড়লাম বর্ষায় রূপনারায়ন নদীর সৌন্দ‍র্য‌্য দেখবো বলে । সকালবেলা হাওড়া থেকে মেচেদা লোকাল ট্রেনে উঠে বসলাম । প্রায় ঘন্টা দুয়েক পর কোলাঘাট ষ্টেশনের আগে দেউলটি ষ্টেশনে নামলাম । ওখান থেকে হেঁটে এবং দুবার অটো পালটে পৌছালাম এক ছোট্ট নিরিবিলি গ্ৰামে। এই গ্ৰামেই ঈশ্বর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি ।

কথাশিল্পী শরৎচন্দ্রের বাড়ি , দেউলটি
                                     কথাশিল্পী শরৎচন্দ্রের বাড়ি , দেউলটি


স্থানীয় লোকের কাছে খোঁজ নিয়ে বাড়ির কাছে এসে পৌঁছালাম । খুব সুন্দর ভাবে রক্ষনাবেক্ষন করা হয়েছে বাড়িটি । এক কেয়ারটেকার এসে বাহিরের গেট খুলে দিলেন ভিতরে প্রবেশ করার জন্যে । উনি একতলার সব ঘরগুলো বাইরে থেকে দেখিয়ে তাঁর ইতিহাস বর্ণনা করলেন ।
পাশের রাস্তা থেকে দেখা শরৎচন্দ্রের বাড়ি
                                     পাশের রাস্তা থেকে দেখা শরৎচন্দ্রের বাড়ি 

ওনার কাছ থেকে জানলাম শরৎচন্দ্রের এক ভাইপো এখন এই বাড়িটির রক্ষনাবেক্ষন করছেন । বাড়ির পিছনে ধানের গোলা, রন্ধনশালা ইত্যাদি সবই রয়েছে । পাশেই একটি শান বাঁধানো ঘাট সহ পুকুর রয়েছে , যে পুকুরের উল্লেখ ওনার কয়েকটি গল্পে পাওয়া গিয়েছে । ওনার বাড়ি থেকে দূরেই দেখা যাচ্ছে রূপনারায়ন নদী । যে নদী একসময় এই বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যেত আজ তা ভাঙনের কারণে দূরে সরে গিয়েছে । পুকুর ঘাটে কিছুক্ষণ বসে তারপর গ্ৰামের পথ দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম রূপনারায়ন নদীর পাড়ের উদ্দেশ্যে । গ্ৰামের মধ্যে কিছুটা ঢুকে তারপর ক্ষেত্রের আল দিয়ে হাঁটা শুরু । কাদা এবং পিছলা পথ এঁকে বেঁকে কিছুটা পার হয়ে অবশেষে নদীর পাড়ে এসে পৌছালাম ।
বর্ষার রূপনারায়ন নদী , দেউলটি
                                                    বর্ষার রূপনারায়ন নদী , দেউলটি 


বর্ষায় জলে ভরাট নদী । মাঝে মধ্যে দু-চারটি নৌকা যাতায়াত করছে , যার অধিকাংশ মাছধরার নৌকা । নদীর পাড়ে ঘাসের উপর বসে ভরা বর্ষার নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করা , সে এক আলাদা অনুভূতি । নদীর পাড় বরাবর স্থানীয় লোকজন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মাছের মিন (চারা) অর্থাৎ চারা মাছ বা ছোট্ট মাছ ধরছে । জানলাম এই কাজ এখানকার মানুষের একটা বড় জীবিকা । এই কাজ থেকে চার ঘন্টায় গড়ে উপার্জন হয় একশো থেকে দেড়শো টাকা । কিছুক্ষণ পরে মেঘের ঘনঘটা । বৃষ্টি শুরু হল । রূপনারায়ন নদীতে বৃষ্টি , সে এক অপরূপ দৃশ্য । পাড়ে বসে সেরূপ দেখার সৌভাগ্য হলো । সাথে ছাতা থাকায় খুব একটা অসুবিধা হয়নি । বেশ কিছু ক্ষন ওখানে কাটিয়ে, কিছু জীবনিশক্তি সঞ্চয় করে কলকাতায় ফেরার পথ ধরলাম ।


Nikhil Dutta

Wednesday, February 27, 2019

মুকুটমনিপুর(বাঁকুড়া) - Mukutmonipur(Bankura)

 ঝাড়খন্ড সীমান্ত লাগোয়া বাঁকুড়া জেলায় কংসাবতী ও কুমারী নদীর সঙ্গম স্থলে অবস্থিত অতি পরিচিত নাম মুকুট মনি পুর।আপনার ব্যস্তময় জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে এখানে হারিয়ে যেতে পারেন দিন দুয়েকের জন্য।

ড্যাম এর একদিকে নীল জল , কোথাও ফুঁড়ে উঠেছে ছোট ছোট টিলা
                                        ড্যাম এর একদিকে নীল জল , কোথাও ফুঁড়ে উঠেছে ছোট ছোট টিলা

ড্যাম : প্রায় 11 কিমি দীর্ঘ এই বাঁধ টিতে গাড়ী বা পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ান। একদিকে সবুজে মোড়া পাহাড় ও ক্ষেত আরেকদিকে নীল জল আর জল ফুঁড়ে উঠেছে ছোট ছোট টিলা।
সূর্যের সোনালী রঙে এই জলরাশি যখন রেঙ্গে ওঠে তাকিয়ে থাকুন সেদিকে। নৌকা বিহারেও সূর্যাস্তের এই অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন।

মুসাফি রানা : বাঁধ লাগোয়া একটি পাহাড়ের উপর এই ভিউ পয়েন্ট টি।সিমেন্টের সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হবে টিকিট কেটে। মাশরুম আকৃতির শেডে বসে উপভোগ করুন চোখ জুড়ানো প্রাকৃতিক দৃশ্য কে।

পরেশ নাথ মন্দির :
আরও কিছুটা এগোলে এবার বামদিকে পিতৃ পাহাড়ের উপর এই শিব মন্দির । এই উন্মুক্ত মন্দির স্থানীয়দের কাছে অতি পবিত্র স্থান। আবার অনেকে জৈন সংস্কৃতির নিদর্শন হিসেবেও মনে করেন। এখান থেকেও নিচের মোহনা ও দূরের বন পুকুরিয়া এর দারুন ভিউ পাওয়া যায়।


সোনা ঝুরি প্রকৃতি ভ্রমন কেন্দ্র :
এটি মুকুট মনি পুরে অবস্থিত WBFDC এর একটি নেচার রিসোর্ট। মুকুট মনি পুরে থাকবার একটি আদর্শ জায়গা।শাল ও পিয়ালে ছাওয়া একটি পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে বনবিভাগের কটেজ গুলি আপনার মন জয় করে নেবে। আর এখানের হিলটপ থেকে ড্যাম ও চারপাশের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে পারবেন ।
(বি: দ্র: - শারীরিক অসুবিধে বা বয়স্ক মানুষ থাকলে বুকিং না করা ভালো)এর ডিটেলস রয়েছে আমাদের ভিডিও তে, দেখতে হলে লিংকে ক্লিক করুন

Koushik Mishra

Monday, February 11, 2019

Silk Route Travel

 আমি চিরকাল যাঁরা tour conduct করেন তাঁদের হিংসে কোরে এসেছি, মনে হতো তাঁরা কি মজাতে সব জায়গায় ঘুরে বেড়াতে পারেন. কিন্তু এবারে সিল্ক রুট ঘুরতে গিয়ে বুঝলাম তাঁদের কাজটা আদপেই সহজ নয়.

সিলারিগাঁও হোমস্টে
                                                                সিলারিগাঁও হোমস্টে

আমি গত ফেব্রুয়ারী মাসের 28 থেকে দোসরা মার্চ জুলুক, সিলারিগাঁও, রিশিখোলা ঘুরে এসেছিলাম. সেবার সেই গ্রুপের মধ্যে সবথেকে adventure প্রিয় ছিলাম আমি, ফলত আমার জন্য মাঝে মাঝেই tension তৈরী হতো.

মেঘলোকের ওপরে..


তারপর lockdownএ প্রায় ঘর বন্দী জীবন, যদিও আমি টুকটাক সফর করার একটা সুযোগও ছাড়িনি. কিছুদিন ধরে আমার কিছু আত্মীয় স্বজন এর সাথে বেড়াতে যাওয়ার পরিকল্পনা চলছিল. তাদেরকে সিল্ক রুটে বেড়ানোর প্রস্তাব দিলে একটু গাঁইগুঁই করে সকলেই রাজি হল.
মেঘলোকের ওপরে..


গতবার যাদের মাধ্যমে ঘুরে ছিলাম সেই দাদাদের শরণাপন্ন হলাম, এবং তাঁরা আশ্বাস দিলেন কোনো চিন্তা নেই সব ঠিক হয়ে যাবে. কিন্তু তাঁরা আশ্বাস দিলেও আমাদের সাথে চারটে বাচ্চা, চারজন কুক্কুট ভক্ষণ করেননা, দুজনের ঠান্ডা লাগার ধাত, এবং প্রত্যেকেই মদামোদপ্রিয়.
কুক্কুট
                                                                        কুক্কুট

ফলত আমি বুঝতে পারছিলাম এরকম একটা 14জনের গ্রুপকে সামলানো মোটেই সহজ হবেনা. তাই বারবার দুই দাদাকে বিভিন্ন প্রশ্ন, আবদার করে জর্জরিত করেছি. তাঁরাও বারবার অভয় দিয়ে গেছেন. এই process চলতে চলতেই আমাদের যাওয়ার দিন এগিয়ে এলো,আমরাও নির্দিষ্ট দিনে দার্জিলিং মেইলে বাক্সপ্যাঁটরা গুছিয়ে উঠে পড়লাম.
নাথাং ভ্যালি
                                                                          নাথাং ভ্যালি

নিউজলপাইগুড়ি থেকে আমাদের সারথি হলেন তেনজিঙ ভাই. সারথি ভালো হলে যুদ্ধ যে অনেকটা সহজ হয়ে যায় এযাত্রায় সেটা আমি খুব ভালোভাবে উপলব্ধি করেছি.
বাবা হরভজন সিং জি
                                                              বাবা হরভজন সিং জি

প্রথমে আমরা পৌঁছালাম সিলারিগাঁও, সেখানে মাউন্টেন ভিউ হোমস্টের সদস্যরা আমাদের স্যানিটাইজার দিয়ে অভ্যর্থনা জানালেন. সেদিন আবহাওয়া মেঘলা থাকার জন্য সবার বহু প্রতীক্ষিত কাঞ্চনজঙ্ঘা আমাদের দেখা দিলেননা.

কাঞ্চনজঙ্ঘা
                                                                                কাঞ্চনজঙ্ঘা 

ইতি মধ্যেই কার রুমে গরম জল চাই, কে চিকেন এর বদলে ডিম খাবে সেসব বুঝিয়ে দেওয়ার পালা শুরু হয়ে গেছিলো. দুপুরের খাওয়ার পর্ব চুকতে বিকেল গড়িয়ে গেলো তাই রামিতি ভিউ পয়েন্টের পথে অল্প হেঁটেই আমাদের ফিরে আসতে হল.
বিখ্যাত রেশমপথ
                                                                        বিখ্যাত রেশমপথ

সন্ধ্যে বেলা চিকেন এবং পমফ্রেট(শিলিগুড়ি থেকে প্যাক করে নিয়ে গেছিলাম) বার্বিকিউ সহযোগে ক্যাম্প ফায়ার এবং হুল্লোড় হল. হোমস্টের পরিচালনা ব্যবস্থা খুব ভালো এবং সবার ব্যবহার খুব আন্তরিক.

রিশি রিভার কটেজ থেকে রিশি নদী..
                                                            রিশি রিভার কটেজ থেকে রিশি নদী..

পরের দিন লুচি তরকারি খেয়ে রওনা দিলাম আমাদের পরের গন্তব্য জুলুকের উদ্দেশ্যে. মাঝে এন্ট্রি পয়েন্ট এবং রংলি বাজারে পারমিটের কারণে একটু সময় লাগলো.

এরপর পাহাড়ের পর পাহাড় পেরিয়ে পৌঁছানো গেলো কিউখোলা ফলস, এখানে কিছুক্ষনের সেলফি বিরতি নিয়ে আমরা যখন জুলুক পৌঁছালাম তখন সূর্য্যদেব বিরক্তিতে রক্ত বর্ণ ধারণ করে পাটে বসতে চলেছেন. আমরা খাওয়া দাওয়া শেষ করতে তিনিও নিদ্রা গেলেন, আর তার সাথে শুরু হল হাড় কাঁপানো ঠান্ডার দাপট. কিভাবে যে শীতকাতুরে সেই সবাইকে তুলে রাতের খাবার খাওয়ানো হয়েছিল সে কেবল আমি জানি.


তারপর রাত্রে -3ডিগ্রির কামড় সহ্য করে সকালে দাওয়াভাই এবং বৌদির নির্ভেজাল সরল আতিথেয়তা(আমরা তাঁদের ঘরের ভেতর ঢুকে উনুন ঘিরে আসর বসিয়ে ফেলেছিলাম) কে বিদায় জানিয়ে রওনা দিলাম কুপুপ এর উদ্দেশ্যে.

আজ সকাল থেকেই ভাগ্য আমাদের ভালো ছিল, গতদিনের মেঘলা ভাব কেটে গিয়ে আজ সূয্যি মামা খোশ মেজাজে ছিলেন. ফলে একটু পর থেকেই কাঞ্চনজঙ্ঘা আমাদের সঙ্গ দিতে থাকলেন. তাঁর অপরূপ রূপ দেখলাম নাথাং ভ্যালি এবং থাম্বি ভিউ পয়েন্ট থেকে. বাবা মন্দিরে বাবার সুস্বাদু প্রসাদ খেয়ে পৌঁছালাম কুপুপ লেক বা এলিফ্যান্ট লেক এ. পুরো রাস্তায় ছড়িয়ে ছিল বরফ,আর বরফ পেয়ে বাচ্চাদের আনন্দ দেখে আমরাও খানিকক্ষণের জন্য শৈশবে ফিরে গেছিলাম. প্রচুর ফটো সেশন এবং বরফ নিয়ে হৈ হুল্লোড় এর পর ফেরার পথ ধরলাম.

আজ রাত্রে আমাদের থাকার ব্যবস্থা ছিল পদমচেন এ. গত রাত্রের দুঃসহ ঠান্ডার পর পদমচেন এর রাত্রিবাস সকলকেই স্বস্তি দিয়েছিলো, তাই সেরাত্রে সবাই বেশ ফুরফুরে মেজাজেই ছিল. আমাদের আতিথেয়তার কোনো ত্রুটি হতে দেননি চাম্বা ভাই তাঁর হোমস্টে তে. এখানে সূর্যাস্তের অপূর্ব দৃশ্য সবার মন ভালো করে দিয়েছিল.

পরের দিনের যাত্রা এই রুটের সব থেকে মজার জায়গা ঋষিখোলার উদ্দেশ্যে. সেখানে রিশি নদীর ধারে মণীকুমারভাইয়ের মনভোলানো হোমস্টে. যেখানে আমাদের গ্রুপের সকল সদস্যই প্রাণ খুলে আনন্দ করেছে.রিশি নদীর ঠান্ডা জলে স্নান করে গরম ভাতের যে কি আনন্দ, সে যাঁরা করেছেন তাঁরাই জানেন. আর হোমস্টের সকলে অত্যন্ত ভালো আর অতিথিপরায়ণ, আমাদের অনুরোধে তাঁরা রিশি নদীর মাছ খাইয়েছেন, রাত্রি পর্যন্ত ক্যাম্প ফায়ার এর আবদার মেনে নিয়েছেন.

পরের দিন ফেরার পালা, রাত্রি 8টার সময় NJP থেকে ট্রেন. তাই সকালে টিফিন টা বাদ দিয়ে একেবারে ভাত খেয়ে বেরোনোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হল, হোমস্টে তে জানিয়ে দিতেই তাঁরা সঙ্গে সঙ্গে রাজি হলেন. তেনজিং আর খালিঙ দুই সারথির রথে আমরা সওয়ার হলাম.

এই যাত্রায় আমি যেহেতু পুরোনো পথিক এবং আমার মাধ্যমেই ব্যবস্থাপনা হয়েছিল, তাই সব ব্যাপারেই সবাই আমার উপর নির্ভর করেছে. এবং দায়িত্ব সামলে সবাই আনন্দ পাওয়াতে আমিও শেষ পর্যন্ত নিশ্চিন্ত হয়েছি. যাঁরা আমাদের সঙ্গে না থেকেও আমাদের ট্যুর টাকে গুছিয়ে দিয়েছেন সেই দুই দাদা গৌচ এবং শা.আ. কে অসংখ্য ধন্যবাদ.

অবশেষে শেষ হল বেড়ানোর পালা, পাহাড় থেকে বিদায় নেওয়ার সময়টা খুব কঠিন হয়ে দাঁড়ায়. তবু ফিরে না গেলে ফিরে আসাও যে আর হবেনা..

Durgasankar Chatterjee

Sunday, January 27, 2019

মৌসুনী দ্বীপ ভ্রমণ - Trip to Mousuni Island

ভ্রমণ প্রিয় বাঙালির কাছে মৌসুনী দ্বীপ আজ একটি জনপ্ৰিয় নাম । কোরোনার প্রকোপ, লকডাউন, আমফান, কোটাল এর ঢেউ সব কিছু বাঁচিয়ে আবার ছন্দে ফিরছে মৌসুনী।
◆ কলকাতা থেকে মাত্র 117km দূরে । পৌঁছে যেতে পারেন নিজের গাড়ি বা বাইকে।
◆ শুরু হয়েছে ট্রেন পরিষেবাও। শিয়ালদা থেকে সকল 7:15 এর নামখানা লোকাল ধরে পারি দিতে পারেন মৌসুনীর উদ্দেশ্যে।

◆ প্রকৃতির কোলে 2টো নির্বিগ্নে শান্তিতে শান্ত পরিবেশে কাটিয়ে ওঠার কথা গেথে যাবে আপনার মনের স্মৃতিতে।  

সুসজ্জিত তাঁবু।

সুসজ্জিত তাঁবু

ঘুরে এলাম ২০শে ডিসেম্বরে মৌসুনী দ্বীপ থেকে সকাল ৭.৩০ শিয়ালদা থেকে নামখানা লোকাল ধরে সকাল ১০টার কাছা কাছি পৌঁছা লাম নামখানাতে ওখান থেকে ভট ভটি করে পৌঁছালাম হুজুতির ঘাট ,খেয়া পার হয়ে আবার টোটো করে পৌঁছালাম মৌসুনি ওয়েভেষ।

সুসজ্জিত তাঁবু

করোনার জেরে জর্জরিত জীবন থেকে সাময়িক একটু মুক্তি।ঝাউবনের মধ্যে সুসজ্জিত টেন্ট , সামনেই সমুদ্র ২ রাত্রি কাটাবার জন্য উপযুক্ত ঠিকানা।আমাদের গন্তব্য ছিল মৌসুনি ওয়েভেষ।

আরাম কেদারা
                                                                আরাম কেদারা

সকালে পৌঁছাতে না পৌঁছাতে মিলল ওয়েলকাম ড্রিঙ্কস হিসাবে ডাবের জল, দুপুরে ভর পেট খাবার ডাল, ভাত,ডিম ভুজিয়া, ফুলকপি আলুর তরকারি, ভেটকি মাছ ভাজা, মাছের কালিয়া চাটনি পাঁপড়।বিকালে গরম গরম চা মুড়ি, পাকোড়া। তারপর শুরু হলো বন ফায়ার গরম গরম চিকেন তন্দুরি। ওটা যদিও এক্সট্রা খরচ ১ কেজি চিকেন ৩৫০ টাকা।

ঝাউবন

                                ঝাউবন

রাতে জুটল চিকেন ,রুটি, স্যালাড, মিষ্টি, আলুভাজা। এই ভাবেই দুদিন ভালোই কাটলো।পরদিন উঠে গরম গরম লুচি,ঘুগনি,ডিম সেদ্ধ,রসগোল্লা।সমুদ্র উপভোগ করে সারাদিন পরদিন ফেরার পালা।


গঙ্গাবক্ষে কিছুক্ষন বোটিং করা পারলে ওখান থেকে জম্বু দীপ যাবেন।খুব কাছে গঙ্গাসাগর কিন্তু আমাদের ভাগ্যে না থাকায় যাওয়া হয়ে ওঠে নি।মৌসুনি থেকে সকাল ১১.২০ তে একটা লঞ্চ ছাড়ে গঙ্গাসাগর যায়।ওখান থেকে ভেসেল পার হয়ে গঙ্গাসাগর।


যারা একটু রোজকার জীবন থেকে মুক্তি চান নিরিবিলিতে থাকতে চান তাদের জন্য আইডিয়াল ট্যুর মৌসুনি। জনপ্রতি খরচ ১১০০ টাকা, আমাদের ২ জনের ২২০০ টাকা টেন্ট এ থাকা খাওয়া। বাচ্চার লাগে নি।


এছাড়া শিয়ালদা থেকে ২৫ টাকা নামখানা।ওখান থেকে ভটভটি ৩০০ টাকা, খেয়া ১০টাকা।আবার টোটো করে দ্বীপ যেতে ৩৫ টাকা জনপ্রতি।


Sunanda Das Chakladar

Sunday, January 13, 2019

সিকিম ভ্রমণ - East Sikkim Tour

 কোনরকম বেড়ানোর অভিজ্ঞতা ছাড়া প্রথমবার East Sikkim ভ্রমণ 

কয়েকদিন আগে পারমাদান নিয়ে আমার লেখা আপনাদের অনেক ভালোবাসা ও প্রশংসা পেয়েছে ওটা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে আজ আরও একবার লেখার সাহস দেখালাম।
বিয়ের আগে কখনো সেভাবে বেড়াতে যাওয়ার সুযোগ হয়নি। আর বিয়ের পর বেড়াতে যাওয়া বলতে তখন ও দীঘা তাও বাসে । একে শীতকাল তার উপর কিছু ছুটি হাতে থাকায় ইচ্ছা হল বেড়াতে যাব আমি হঠাৎ করে ও কে ধরে বসলাম সিকিম বেড়াতে যাব। ও, পড়ল মহাফ্যাসাদে, ওর ও যে বেড়াতে যাওয়ার ইচ্ছা নেই এমন নয় বরং উল্টোটাই, ইচ্ছা আছে ষোলোআনা কিন্তু ঠিক নিজের উপর ভরসা করতে পারছিল না তাই প্রথম দিকটায় আমতা আমতা করছিল তার একটি কারণ, ওর এর আগে তেমন বেড়াতে যাওয়ার কোনো রকম অভিজ্ঞতা নেই আর আমার তো নেইই। তখন দুটি পথ খোলা এক ভয় পেয়ে পিছিয়ে আসা বা অন্যদের সাথে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করা আর দুই সাহস করে নিজেরাই বেরিয়ে পরা।ভয় পেয়ে পিছনে হাঁটাটা ঠিক ধাতে সয় না আর তার উপর আছে নতুন কিছু শেখার আগ্রহ তো আমরা দ্বিতীয় পথটাই অনুসরণ করলাম।
তিস্তা নদীর এ অপরুপ শোভা
তিস্তা নদীর এ অপরুপ শোভা 
কিন্তু কিভাবে যাওয়া হবে একদিকে ছুটি ফুরিয়ে যাচ্ছে আর অন্যদিকে ট্রেনের টিকিট একটি দিন করে যাওয়ার সাথে সাথে ভর্তি হয়ে যাচ্ছে। তখন সাত পাঁচ না ভেবে 'ও' হঠাৎ করে নিজেই মোবাইল এ IRCTC থেকে টিকিট কেটে নিল কামরূপ এক্সপ্রেসের । ফেরার টিকিট কাটার সময় আর একটি মজার ব্যাপার হল সেখানেও আমি জেদ ধরে বসলাম দার্জিলিং মেলই ফিরব ছোটো থেকে অনেকবার এই নামটি শুনে একটা সুপ্ত ইচ্ছা ছিল মনে, একবার অন্তত বেড়াতে যাওয়া বা আসার সময় উঠব । যেমন কথা তেমন কাজ টিকিট পেলাম কিন্তু RAC এখানে বলে রাখি আমাদের এমন ই অবস্থা তার আগে জানা ছিল না RAC কী যাইহোক এখানে ও সেই Google বাবার দারস্থ হতে হল। সত্যি বলতে এর আগে নিজের রাজ্যের বাইরে তো দূরে থাক কলকাতার বাইরে কখনো আমরা দীঘা ছাড়া কোথাও যাইনি দুজনের কেউ।
বাবা মন্দির যাওয়ার পথে
বাবা মন্দির যাওয়ার পথে
যাওয়া তো হবে কিন্তু tour plan সেটা কী ভাবে সাজানো হবে অন্যেরা সাধারণত আগে সেটা করে পরে টিকিট কাটে আমাদের ক্ষেত্রে হল উল্টো টা। এখানে একটা কথা বলব চেনা জানা যারা এর আগে বেড়াতে গিয়েছে তাদের সাথে আমারা কথা বলে বুঝলাম পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে অনেক মানুষ এর শারীরিক সমস্যা হয় উচ্চতার জন্য ফলে আমরা তখন নির্দিষ্ট ট্যুর প্ল্যান করে যাইনি তার বদলে ওই জায়গা সম্পর্কে যতটা জানা যায় জেনে নিলাম যাতে ওখানে গিয়ে নিজেদের শারীরিক অবস্থা বুঝে ট্যুর প্ল্যানcustomize করতে পারি অনেকটা ঠিক অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেওয়ার মতো। যেটা পরবর্তীকালে আমাদের অনেক কাজে আসে।
গ্যাংটক যাওয়ার পথে । পাশে তিস্তা নদী
গ্যাংটক যাওয়ার পথে । পাশে তিস্তা নদী 
যত যাওয়ার দিন এগিয়ে আসতে লাগল তত আনন্দ উত্তেজনা মনকে আরও জাঁকিয়ে ধরল মিথ্যে বলব না সাথে কিছুটা হলেও বুক দুরুদুরু করছিল সেটাকে বেশি পাত্তা না দিয়ে মত্ত হলাম বেশ কিছু শীতের পোশাক কেনাকাটাই প্রথমবার বুঝতে পারলাম বেড়াতে যাওয়ার আনন্দ, কিসের টানে মানুষ বারবার ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে পড়ে।
Do-drul Chorten (stupa)
Do-drul Chorten (stupa)

দেখতে দেখতে এসে গেল নির্দিষ্ট দিন, আমরা ট্রেন টাইমের ঘন্টা খানেক আগেই পৌঁছে গেলাম হাওড়া স্টেশনে, ও বলল হাতে যখন টাইম আছে স্টেশন টা একটু ঘুরে দেখা যাক। তার আগে আমরা ঠিক করেছিলাম আমাদের সিকিম ভ্রমণটা vlog হিসেবে শ্যুট করবো দেখতে গেলে এটাই ছিল আমাদের ভ্লগের হাতে খড়ি,ওর উপর দায়িত্ব পড়ল vlog শুট করার, আগেই বলে রাখি আমি দুএকটা বেশী কথাই বলতে পারেনি কারন তখনও camera friendly ছিলাম না।

আগে জানতাম এ এই কাপড় গুলিতে আনেক কিছু লেখা থাকে

আগে জানতাম এ এই কাপড় গুলিতে আনেক কিছু লেখা থাকে

যাইহোক ট্রেনে প্রথমবার রাত্রি যাপন এর অভিজ্ঞতা, চেষ্টা করলাম ঘুমানোর কিন্তু ঘুম বাবাজীর দেখা মিলল না কখন সকাল হবে সেই প্রহর গুনেই রাত কেটে গেল। পরদিন সকালে NJP তে নেমে 'ও' ঠিক করে নিল শেয়ার ট্র্যাক্সি, গাড়ির সামনের সিট দুটো আমাদের দখলে থাকায় রাস্তার দুধারের ও সামনের দৃশ্য দেখতে দেখতে কখন যে অর্ধেকের বেশি রাস্তা পেরিয়ে এলাম বুঝতেই পারলাম না রাস্তা থেকেই দূরের পাহাড় গুলো দেখতে পেয়ে মন ভরে গেল। আমাদের প্রথম দিনের ড্রাইভার দাদাটাও বেশ ভালো মাঝে মাঝে ওনার সাথে টুকটাক কথা হতে থাকল ওনাদের লোকাল সংস্কৃতি নিয়ে, কথাটা প্রথম উঠল আমাদের গাড়িতে চলতে থাকা নেপালী গান নিয়ে, বেশ ভাব জমে গেল 'ও'র সাথে ওনার, কথা বলে হোটেল ও স্থানীয় জিনিস গুলি সম্পর্কে আরও অনেক তথ্য পাওয়া গেল। এভাবেই পৌঁছে গেলাম আমাদের গন্তব্যস্থল গ্যাংটক। গিয়েই MG Marg এর উপর একটি হোটেলে রুম দেখে 'ও' বুক করে নিল মোটের উপর ছিমছাম ও পরিস্কার পরিচ্ছন্ন। মন বাইরে বেরোতে চাইলেও তখন আর শরীর পারছিল না তার আগের দুই রাত্রি না ঘুমানোর ফল। যাইহোক স্নান সেরে দুজনে বেরিয়ে দুপুরের খাবার টা খেয়ে ফিরে এলাম রুমে, এসে একটা জাঁকিয়ে ঘুম দিলাম সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে মুছে সাফ। বিকাল থেকে MG Marg এ সময় কাটল, সন্ধ্যা বেলা MG Marg এ আলোর সাজে সেজে উঠছে স্থানীয়দের সাথে কথা বলে বুঝলাম ওখানকারLosoong festival ( Sikkimess new year of the Bhutia tribe) প্রস্তুতি চলছে। এর মাঝে travel agent এর সাথে কথা বলে নিল 'ও' দ্বিতীয় দিন sight scene এ যাওয়া নিয়ে।
সোনালী কাঞ্চনজঙ্ঘা ।
সোনালী কাঞ্চনজঙ্ঘা 

পরদিন ভোরে উঠে আমাদের রুমের জানলা দিয়ে দেখলাম কাঞ্চনজঙ্ঘা, কি অপরূপ দেখতে লাগছে সকালের সূর্যের আলো পরার সাথে সাথে আরো সুন্দর লাগছে তাকে সে দৃশ্য সত্যি এ জীবনে ভোলার নয়। ওখানে MG Marg এ আমাদের সাথে হঠাৎ পরিচয় একটি নেপালী কাপল এর সাথে ওদের সাথে শেয়ার গাড়ি করে sight scene করে নিলাম। এখানে বলে রাখি আমরা কোনরকম একটি travel agent এর থেকে ফুল প্যাকেজ কিছু নেয়নি নিজেদের মতো করে ২-৩ জন এর সাথে কথা বলে তবেই ঠিক করি। তৃতীয় দিনে ঠিক ছিল east Sikkim অর্থাৎ ছাঙ্গু লেক, বাবা মন্দির, নাথুলা ঘুরব কিন্তু কপাল খারাপ sight scene করে ফিরে এসে বৃষ্টি পড়ছে, travel agent এর কাছে গিয়ে পারমিশন হয়েছে কিনা জানতে চাওয়ায় উনি বললেন কাল সকালে আসুন ছাঙ্গু তে আজ হঠাৎ বরফ পড়ায় নুতন করে আর পারমিশন হচ্ছে না ।
লাল বাজার বা মার্কেট এর ছাদ থেকে view
                                                    লাল বাজার বা মার্কেট এর ছাদ থেকে view

তৃতীয় দিন সকালে গিয়ে হতাশ হয়ে ফিরতে হল উনি বললেন “আগামীকালও হবে কিনা তাও বলতে পারব না আমার অনেক গাড়ি উপরে আটকে সারারাত, তারা এখনও ফিরতে পারেনি” উনি টাকা ও ফেরত দিয়ে দিলেন। আমরা শুধু ওনার উপর ভরসা না করে sikkim tourism এর অফিস এমনকি ড্রাইভার দাদা দের সাথে কথা বললাম সবাই এক্ই কথাই বললেন। তখন আমরা ওই দিনটা নষ্ট না করে কাছেপিঠে হাঁটা দূরত্বে জায়গা গুলি দেখে নিলাম। ভাগ্যিস হাতে ১টা দিন সময় নিয়ে গিয়েছিলাম নিজেদের মত ঘুরবো বলে সেটা কাজে এসে গেল তাই আমাদের হাতে আর ও ১ টি দিন ছিল। এর মধ্যে 'ও' বারবার নিজে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসল অবশেষে সন্ধ্যাবেলা অন্য একজন travel agent এর থেকে পজিটিভ খবর পাওয়া গেল আমাদের পারমিশন এর জন্য যাবতীয় ডকুমেন্ট ও টাকা দিয়ে আসা হল যদিও তখনও কনফার্ম নয় পরদিন সকালে রেডি হয়ে যেতে বললেন ।
লাসুং ফেস্টিভাল
                                                                            লাসুং ফেস্টিভাল
চতুর্থ দিন ভোর থেকে ও উঠে কাঞ্চনজঙ্ঘা র অপূর্ব দৃশ্য ক্যামেরা বন্দি করল তারপর রেডি হয়ে ট্যাক্সি স্ট্যান্ড। না সেদিন আর ভাগ্য অপ্রসন্ন হল না, পারমিশন হয়েছে যাওয়া হবে কিন্তু নাথুলার রাস্তা তখন ও বরফ না সরায় ওটাতে কাউকে পারমিশন দেয়নি, যাওয়া হচ্ছে বাকি দুটি জায়গা সেটাতেই আমরা খুশি। যাওয়ার পথে গাড়ির পারমিট এর জন্য বেশ খানিকটা সময় নষ্ট হল। পাহাড়ি রাস্তা ধরে গাড়ি উপরে উঠতে থাকল আমাদের মতো আর ও অসংখ্য গাড়ি সারি বেঁধে উপরে উঠছে দেখতে কিন্তু ঠিক পিঁপড়ের সারি বেঁধে আসার মতো। যত উপরে উঠতে লাগলাম রাস্তার দুপাশে গাছের উপর তখন ও বরফ দেখতে পেলাম। প্রথমে গেলাম বাবা মন্দির তারপর বরফ জমা হাঙ্গু ও ছাঙ্গু লেক দেখতে দেখতে সারাদিনটাই কেটে গেল ফেরার পথে অস্তমিত সূর্যের আলোকে পাহাড় কে দেখতে আর ও অপূর্ব লাগছিল সে এক অন্য অনুভূতি। ফিরে এলাম গ্যাংটক এ সন্ধ্যার সময়, ফিরেই ওই ঠান্ডাতেও গরম জলে স্নান করে ফ্রেশ হয়ে নিলাম এবার পেট চুঁইচুঁই করতে লাগল খিদেতে, 'ও' গিয়ে ২ প্লেট মোমো প্যাক করে আনল খেয়েই বেরিয়ে পড়লাম MG Marg এ পরদিন ফিরব তাই যতটা সম্ভব ঘুরে নেওয়া যায় আরকি টুকটাক কেনাকাটা করে রাতের খাবার খেয়ে ফিরলাম।ফিরে এসে মোটামুটি প্যাকিং করে ঘুমিয়ে পড়লাম।
বাবা হরভজন সিং এর bedroom
বাবা হরভজন সিং এর bedroom

পরদিন সকালে MG Marg এর ওখান থেকেই প্রাতরাশ খেয়ে স্নান সেরে গ্যাংটক কে 'টা টা' করে ট্যাক্সি করে চলে এলাম তেনজিং নোরগে বাসস্ট্যান্ডে।আমাদের ট্রেন ছিল রাত আটটার দার্জিলিং মেল। এখানে এসে জানতে পারলাম ট্যাক্সি খুবই কম সেদিন, নীচের ট্যাক্সি আসবে তারপর যাবে। তখন 'ও' সময় নষ্ট না করে বাসের টিকিট কেটে নিল বাস আবার শিলিগুড়ি পর্যন্ত অগত্যা কি আর করা। ফেরার পথে অদ্ভুত ঘটনার সাক্ষী হলাম। সেদিন এত জ্যাম রাস্তায় ৫ ঘন্টার রাস্তা ৭ ঘন্টা লেগে গেল তাও পৌঁছাতে পারছি না আমিতো প্রথমে প্যানিক করে যাই কিন্তু ও’র মাথা ঠান্ডা ও তখন ভাবতে লাগল এই ট্রেন মিস হলে ওখানে গিয়ে যাওয়ার উপায় কী! কিন্তু ওই যে বলে না কপাল, বাসের যিনি ড্রাইভার দাদা ছিলেন উনি বুদ্ধি করে অন্য রাস্তা বেঙ্গল সাফারির পাশের রাস্তা দিয়ে বাস নিয়ে গিয়ে সে এক অন্যরকম অভিজ্ঞতা মাঠের মধ্যে দিয়ে কিছু কিছু জায়গা জল জমে আছে ওখান থেকে নিয়ে গিয়ে মোটামুটি ট্রেন টাইম এর ৪০ মিনিট আগে এসে নামিয়ে দিল শিলিগুড়ি SNT বাসস্ট্যান্ডে ওখান থেকে অটো করে Njp এককথায় প্রায় ছুটোছুটি করে ট্রেন ছাড়ার ৫ মিনিট আগে ট্রেনে এসে উঠলাম। ট্রেন ছাড়ার সময় দেখলাম বেশ অনেক সিট ফাঁকা। যে ট্রেনে RAC ছিল সেই ট্রেনে দেখলাম সবাই হাত পা ছড়িয়ে চলে এল। পরে জানতে পারলাম জ্যামে আটকে বহু মানুষ সেদিন ট্রেন মিস করেন । ভগবান কে অসংখ্য ধন্যবাদ আমাদের প্রথম ভ্রমণ অভিজ্ঞতাটা সুন্দর করার জন্য না কোনরকম শারীরিক সমস্যা হয়নি বেশ ভালোভাবে ঘুরে বাড়ি ফিরলাম। তবে এই ট্যুর আমাদেরকে অনেক কিছু শেখাল।

Pinki Paul