• Estuary of Teesta and Rangit Rivers

  • Teesta View Point

  • Chatakpur, Darjeeling

  • Chilapata Forest

Friday, June 7, 2019

কলকাতার ফিরিঙ্গি কলোনি বো ব্যারাক - Bow Barracks, Central Kolkata

 বড়দিনে, অন্য ইতিহাসের সন্ধানে- কলকাতার ফিরিঙ্গি কলোনি বো ব্যারাকে।

বড়দিন হয়ত খ্রিষ্ট ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব, কিন্তু এই উৎসবের আবেদন সার্বজনীন, এবং বিশ্বজনীন। সারা পৃথিবী জুড়েই জাতি-ধর্ম-বর্ন নির্বিশেষে এই উৎসব পালিত হয়।বড়দিনের উৎসবে ক্রিসমাস ট্রি, রঙিন টুনি দিয়ে যেমন ঘর সাজানো হয়, তেমনি কেক কাটা, পিঠে পুলি তৈরি, বিশেষ ডিনারের ব্যবস্থা,প্রিয়জনকে গ্রিটিংস কার্ড, উপহার দেওয়া ইত্যাদি যুগ যুগ ধরে চলে আসছে। বড়দিনে প্রিয়জনকে উপহার দেওয়া নিয়েই তো লেখা হয়েছে পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ছোটগল্প " দ্য গিফট অফ দ্য ম্যাগি"। তবে বড়দিনের আগ্রহ ও আনন্দ বোধহয় সবচেয়ে বেশি উপভোগ করে , ছোট ছোট বাচ্চাগুলি। সান্তা ক্লজের কাছ থেকে পাওয়া যায় কত উপহার আর চকলেট।
বো ব্যারাকে বড়দিনের সন্ধ্যায়


সেই কোন সুদূর উত্তর মেরু থেকে সান্তা বুড়ো রওয়ানা দিয়েছে তাঁর নয়টা বলগা হরিণে টানা স্লেজ গাড়ি চেপে, পিঠের ঝোলায় ভরা কত উপহার। পৃথিবীর দেশে দেশে বাচ্চারা জেগে বসে থাকে সান্তা বুড়োর জন্য। কিন্তু বুড়ো যে ঠিক কখন চুপিচুপি এসে উপহার দিয়ে যায়, সেটা আর কোনদিন তাদের দেখা হয়না। ঘুম থেকে উঠে উপহার দেখে বাচ্ছাগুলির বিস্ময়ে ভরা গোল গোল চোখ আর মুখে যে হাসি দেখা যায়, আর কোন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে তা দেখা যায় কিনা জানিনা।
এবারে আসি বড়দিন ও এঙ্গলো ইন্ডিয়ান কলোনি বো ব্যারাকের প্রসঙ্গে।

সে প্রসঙ্গে যাবার আগে ছোট্ট করে এখানকার এবং সামগ্রিক ভাবে এঙ্গলো ইন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের সম্মন্ধে কিছু নির্জলা সত্যি কথা জানাই।
কথা হচ্ছে এঙ্গলো ইন্ডিয়ান কারা ? সাদামাটা ভাবে বলা যায় মিশ্র রক্তের ইউরোপিয়ান( পড়ুন ইংরেজ পিতা) এবং এশিয়ান ( পড়ুন ভারতীয় মাতার) সঙ্কর জাত ইউরেশিয়ান সম্প্রদায় যারা জন্মেছিল ভারতে, ধর্মে ছিল খ্রিস্টান এবং মাতৃভাষা ছিল ইংরেজী। যেহেতু এরা দেখতে ছিল অনেকাংশে ইউরোপিয়ানদের মতন, ভাষা ও ধর্ম ভিন্ন , তাই ভারতীয়রা তাঁদের আপনজন বলে কখনও স্বীকার করেনি।


কিন্তু কেন এই বৈষম্য ?
স্বাধীনতার পূর্বোত্তর থেকে স্বাধীনতা পরবর্তীতেও দেশ ও দশের উন্নয়নের কাজে অসংখ্য ফিরিঙ্গির অবদান আছে। যেমন হেনরী লুই ডিরোজিও, জেমস কিড(যাঁর নাম থেকেই কিডের পুর বা খিদিরপুর), লেসলী ক্লডিয়াস, ফ্রাঙ্ক এন্থনী, রজার বিন্নী, কার্লটন চ্যাপমান, উইলসন জোন্স এবং এরকম আরো অনেকেই আছেন।বেশি পিছনে যাবার দরকার নেই, স্বাধীন ভারতের প্রথম অলিম্পিক গোল্ড আসে লন্ডন অলিম্পিকে, ১২ ই আগস্ট, ১৯৪৮ এ, ফিল্ড হকি থেকে, ৪-০ গোলে ব্রিটেন কে হারিয়ে। সেই খেলা নিয়ে তৈরি গোল্ড সিনেমা তো অনেকেই দেখেছেন, কিন্তু জানেন কি, সেই টিমে সর্বমোট ৯ জন এঙ্গলো ইন্ডিয়ান প্লেয়ার খেলেছেন। ফাইনালে বলবীর সিং দুটি গোল করেন। বাকি দুটি গোল করেন দুই এঙ্গলো ইন্ডিয়ান খেলোয়াড় Jansen এবং Pinto ,একটি একটি করে। আর হকিতে বিলাসপুর/ কলকাতার লেসলি ক্লডিয়াসের তিনটি সোনা এবং একটি রুপোর মেডেল জয়ের রেকর্ড হকির জাদুগর ধ্যানচাঁদেরও নেই।

সবচেয়ে দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার ছিল, খাঁটি ইংরেজরা এঙ্গলো দের সঙ্গেও দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিকদের মতন ব্যাবহার করতেন।ইউরেশিয়ান দের নিয়োগ করা হতো রেল, খনি, পোস্ট অফিস ইত্যাদি চাকরিতে, কিন্তু খাঁটি ইংরেজরা সামাজিক বিত্ত এবং সম্মানের প্রশ্নে যোজন দূরত্ব বজায় রাখতেন ইনাদের সঙ্গে। বন্ধুবর অমিতাভ পুরকায়স্থ চমৎকার বলেছেন- " শাসক ও শাসিতের মধ্যে যে দৃঢ় সামাজিক ভেদরেখা তৈরি করতে চাইছিলেন ব্রিটিশ শাসকেরা, তা বারবার গুলিয়ে যাচ্ছিল এই মিশ্র রক্তের জনগোষ্ঠীর জন্য"। অর্থাৎ এদের ট্রাজেডি ছিল- এরা না ঘরকা, না ঘাটকা।
যাইহোক ফিরে আসি বো ব্যারাকে।
এই শহরের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আরেকটি অন্য শহরের ইতিকথা। আত্মশ্লাঘায় ভরপুর বাঙালি, প্রায় সারা বছর তার কোন খোঁজই রাখেনা। প্রথম মহাযুদ্ধের সময় আমেরিকান সেনাদের থাকার জন্য মিলিটারি ব্যারাক হিসাবে প্রায় তিনবিঘা জায়গার ওপর দুই সারিতে, সাতটি ব্লকের এই লাল রঙের বাড়িগুলি তৈরি করা হয়। যেহেতু মিলিটারি ব্যারাক হিসাবে তৈরি, তাই এই বাড়িগুলির নান্দনিকতা নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় নি।যুদ্ধের প্রয়োজনে ক্যালকাটা ইম্প্রুভমেন্ট ট্রাস্ট এগুলিকে তৈরি করে। যুদ্ধের শেষে আমেরিকান সেনারা দেশে ফিরে গেলে, হাত বদল হয়ে এগুলিতে চলে আসেন কলকাতার কিছু এঙ্গলো ইন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের লোকজন।তবে যেকথা আগেই লিখলাম, এঁদের সম্মন্ধে আমরা নিতান্তই উদাসীন।
২০১৭ সালের বড়দিনে ছিলাম বো- ব্যারাকে । তখন দেখেছিলাম এখানকার বাড়িগুলির দশা নিতান্তই করুণ।এই অবহেলিত, জীর্ণ বাড়িগুলি দেখে আমার হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া বিখ্যাত গানটির কথা মনে হয়-
" শোন বন্ধু শোন, প্রাণহীন এই শহরের ইতিকথা,
ইঁটের পাঁজরে, লোহার খাঁচায় দারুন মর্মব্যথা।
এখানে আকাশ নেই, এখানে বাতাস নেই,
এখানে অন্ধ গলির নরকে মুক্তির আকুলতা।"
এই আকুলতাকেই সঙ্গী করে এই বাড়িগুলিতে এখনও প্রায় ১৩২ টি পরিবার বাস করছে, যার বেশিরভাগই এঙ্গলো ইন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের। তবে বো ব্যারাক কিন্তু একেবারে কসমপলিটান চরিত্রের। তাই এখানে এঁরা বাদ দিয়েও, বাঙালি, অবাঙালি, ভারতীয় চীনা সবাই মিলে মিশে আছেন।শুধু তাই নয়, এখানেই আছে ১ নম্বর বুদ্ধিস্ট টেম্পল স্ট্রীটের উপর " বৌদ্ধ ধর্মাঙ্কুর সভা"। সেন্ট্রাল মেট্রো স্টেশন থেকে হাঁটা পথে, চিত্তরঞ্জন এভেন্যু এবং বৌবাজারের মোড়ে, বউবাজার থানার পিছনেই অবস্থিত এই জীর্ণ বাড়িগুলিরই গাল ভরা নাম- বো ব্যারাক।
দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পরে একসময় এই বাড়িগুলি ভেঙে ফেলার কথা উঠেছিল। ভাগ্যিস ভেঙে ফেলা হয়নি, তাইতো এখনও খাঁটি হোম মেড ওয়াইন এবং এঙ্গলো ইন্ডিয়ান হেঁশেলের স্বাদ নিতে , বড়দিনের সময় সারা কলকাতার ইন্টেলেকচুয়াল বাঙালি হামলে পরে এখানে। তবে সত্যি কথা, ওয়াইন, কেক, বিভিন্ন ধরনের মাংসের রোস্ট ইত্যাদি বাদ দিলে, এদের কিচেনেও প্রায় ষোল আনা বাঙালি স্বাদ পাবেন খাবারে। মনে পড়ছে ম্যাকলাস্কিগঞ্জে ববি গর্ডনের বাড়িতে, ববির মায়ের হাতের রান্নার সঙ্গে আমার মায়ের হাতের রান্নার স্বাদের আদৌ কোন তফাৎ লাগেনি। চীনা রান্নার বিভিন্ন পদও এরা সাগ্রহে তৈরি করে।
কেউ কেউ বলেন যে, কে আই টি নাকি এই ফ্লাট গুলি বাসিন্দাদের বিক্রি করে দিয়েছে, আবার indian Express এ দেখছি তা নয়। এখানে এখনো মান্ধাতা আমলের বাড়ি ভাড়া ৩০/- টাকা বজায় আছে, যা কে আই টি নিতে অস্বীকার করে।KIT এবং KMDA ১৯৯৯ সাল থেকে এই বিপদজনক বাড়িগুলি ভেঙে,বর্তমান বাসিন্দাদের জন্য, নতুন করে হাউসিং কমপ্লেক্স তৈরির চেষ্টা করেছিল। ২০১৭ সালে মোটামুটি ৪০ মিনিটের জন্য পানীয় জল ছাড়া আর কোন পরিষেবা KIT থেকে পাওয়া যেত না। এছাড়া পুরো কমপ্লেক্স পরিষ্কারের কাজে তখন একজন মাত্র সুইপার বহাল ছিল ।
পরিষেবা বন্ধ, জীবন হাতের মুঠোয় নিয়ে বেঁচে থাকা, অধিকাংশ বাসিন্দাই বৃদ্ধ-বৃদ্ধা, তবুও এঁদের বেঁচে থাকার অদম্য ইচ্ছাশক্তি এবং মনোবল অটুট। নিজেদের মধ্যে ক্লাব, হাউসি, পার্টি, হোম মেড ওয়াইন, বলডান্স ইত্যাদি নিয়ে এরা হৈ হুল্লোড় করেই থাকেন। আর যখন ঘরে একা থাকেন, তখন নীরবে চোখের জল ফেলেন- ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড প্রবাসী ছেলে-মেয়ে, নাতি নাতনীর জন্য।
এক নামি পরিচালক কিছুদিন আগে বো ব্যারাক নিয়ে একটি ছবি করেছিলেন ।অনেকেই হয়ত ছবিটা দেখেছেন।অনেকের হয়ত মনে হতে পারে, এরা যখন এত হুল্লোড়ে তখন হয়ত কিছুটা উশৃঙ্খল এঁদের জীবনযাত্রা। কিন্তু আদপেই তা নয়। এরা অত্যন্ত অবহেলিত সম্প্রদায়, মাছে- মাংসে- ভাতে এরাও কিন্তু আমাদেরই মতন ছাপোষা ভদ্রলোক।
আমরা যতই গান গাইনা কেন- শক হন দল পাঠান মোগল একদেহে হোল লিন- স্বাধীনতার পূর্বে এবং পরেও, এই ফর্সা, কটা চোখের ট্রেনের ড্রাইভার/ গার্ড/ কলিয়ারীর ওভারম্যান/সওদাগরি অফিসের টাইপিস্ট বা পি এ দের কখনও অন্তর থেকে আপন করে নিতে পারিনি, আমাদের চোখে এই হতভাগ্য লোকগুলি কলোনিয়াল যুগের প্রতিভূ। সেজন্য একদা যে লোকগুলি নিজেদের মুলুক তৈরি করেছে ভারতে, রাঁচির কাছে ম্যাকলাস্কিগঞ্জে, সগর্বে বলেছে ইন্ডিয়া ইজ আওয়ার মাদারল্যান্ড, অসংখ্য ইংরেজি মাধ্যমের ভালো স্কুল স্থাপনা থেকে প্রথম অলিম্পিক গোল্ড মেডাল অর্জনে যাঁদের বিশাল ভূমিকা ছিল, তাঁরা কিন্তু পরিষ্কার বুঝে গেছে এদেশে এখনও তাঁরা অবাঞ্ছিত। রাজনৈতিক ও সামাজিক পালাবদলের ঝড় এই মানুষগুলির পক্ষে শুভ সংকেত বয়ে আনেনি। এরই নিটফল আজকের এঙ্গলো ইন্ডিয়ান নতুন জেনারেশনের ম্যাসিভ এক্সডাস বা দেশত্যাগ। কলকাতার বো ব্যারাক থেকে রাঁচির ম্যাকলাস্কিগঞ্জ সর্বত্র একই ইতিহাস। ক্রিসমাসের সময়ের বো ব্যারাকের রঙীন ছবিই সব নয়। অন্য সময় এসে এঁদের সঙ্গে আলাপ করেই দেখুন না।ক্রিসমাসের সময় দুপুর/বিকালে এসে এঁদের হেঁশেলের স্বাদ নিতে পারেন। সন্ধ্যার পরে কেবল হৈ চৈ, তখন আবার অন্য এক ধরণের মজা, থিকথিক করছে লোক, ক্যামেরা, ফটোগ্রাফার, মিডিয়ার ভিড়ে জায়গা পাওয়াই দায়।
বো ব্যারাক শুধুমাত্র একটি বিশ্বযুদ্ধের ঐতিহাসিক স্মারক নয়। এঙ্গলো ইন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যবাহী বহমান ইতিহাসের সাক্ষী এটি।
সান্তাক্লজ রিকশা চেপে একমাত্র বোধহয় এইখানেই নামেন। খ্রিস্টমাসের অন্তত ১ সপ্তাহ আগে থেকেই এখানে সাজোসাজো রব পরে যায়, খেলাধুলা থেকে জাতি ধর্ম নির্বিশেষে ফুড প্যাকেট বিতরণ করা , সংগীতানুষ্ঠান ইত্যাদি বহু অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। পার্ক স্ট্রিট কার্নিভালের গ্রান্জার এখানে পাবেননা, পাবেন ইতিহাসের মোড়কে এক হৃদয়স্পর্শী অনুভূতি।
কেন যে বো ব্যারাকের বাড়িগুলিকে হেরিটেজ বলা হচ্ছেনা, জানিনা।
চলুন এবার বড়দিনে- অন্য ইতিহাসের সন্ধানে- বো ব্যারাকে।
ছবি: বো ব্যারাকে বড়দিনের সন্ধ্যায়।
ঋণ স্বীকার:-
1)খিদিরপুরের কিড সাহেব, amitava.wordpresd.com/2017/08/08
2)ইঁটের পাঁজরে বিশ্বযুদ্ধের অজস্র ছাপ, কলকাতার নস্টালজিয়ায় 'অ্য।্লো্' পাড়ার রঙিন ইতিহাস।দোলন চট্টোপাধ্যায়। News18BANGLA, August 2, 2017
3) Rehabilitation of Bow Barracks residents hang in balance. Madhuparna Das, Mon Dec 15 2008, archive.indianexpress.com/news/rehabilitation

Tilak Purkayastha

Wednesday, May 15, 2019

Eden Gardens Park

বলা হয়ে থাকে কলকাতায় পার্ক কালচার আসে ব্রিটিশদের হাত ধরেই। সেসব আজকের কথা নয়। ফোর্ট উইলিয়ামের পার্শ্ববর্তী স্থানে গড়ে ওঠে কলকাতার অন্যতম প্রাচীন দুই পার্ক।

একটি কার্জন পার্ক নামে বিখ্যাত ও অপরটি ইডেন গার্ডেন। ইডেন গার্ডেন নামের সঙ্গে কেবল কলকাতা নয়, পরিচিত এই বিশ্বের অনেক মানুষই। অথচ আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামটির নাম ইডেন গার্ডেন রাখা হয় পার্শ্ববর্তী পার্কের নামে। একথা অনেকেই জানেন না। ১৮৩৬ সাল থেকে ১৮৪২ সাল পর্যন্ত ভারতের গভর্নর জেনারেল ছিলেন লর্ড অকল্যান্ড। তাঁরই মস্তিষ্কপ্রসূত এই বাগান।


অকল্যান্ডের প্রথম আর্ল, জর্জ ইডেন লর্ড অকল্যান্ড নামে জনপ্রিয় ছিলেন ভারতে। সাত বছর গভর্নর জেনারেল হিসাবে থেকেছেন কলকাতায়। নিয়মিত বসবাস করেছেন। পিতা উইলিয়াম ইডেনের চৌদ্দজন সন্তানের মধ্যে তাঁর ঘনিষ্ঠ দুই সহোদরা এমিলি ও ফ্যানি তাঁর কর্মরত অবস্থায় ঘুরতে আসেন কলকাতা। পরে ভাইয়ের কাছেই থাকতে শুরু করে দেন কলকাতাকে ভালোবাসে। জর্জ ইডেনের বোনেদের মধ্যে এমিলি ছিলেন শিল্পী।


তিনি কলকাতার সংস্কৃতি সম্বন্ধে জানতে ও এখানকার শিল্পের ব্যাপারে ভীষণই উৎসাহী ছিলেন। এসবের বাইরেও উৎসাহ ছিল গাছ ও বাগানে। বোনেদের কলকাতায় থাকাকালীনই তাই ইডেন গার্ডেন তৈরির কাজে উদ্যোগ নেন জর্জ ইডেন (লর্ড অকল্যান্ড)। বিখ্যাত আর্কিটেক্ট ক্যাপ্টেন ফিজগেরাল্ডের তত্ত্বাবধানে ও নকশায় এই বাগানের কাজ সম্পূর্ণ হয় ১৮৪০ সালে। অকল্যান্ড সার্কাস গার্ডেন নামক এই বাগান অবশেষে ইডেন বোনেদের স্মৃতিতে নাম নেয় ইডেন গার্ডেন এবং বাগানে প্রবেশ অবাধ করে দেওয়া হয় সাধারণ মানুষের জন্য।


এবার আসা যাক বার্মিজ প্যাগোডাটির কথায়। যাঁরা একবার হলেও গেছেন এই বাগানে নিশ্চয় লক্ষ্য করেছেন এই অদ্ভুত সুন্দর প্যাগোডাটিকে। গড়ন দেখলেই বোঝা যায় এটি খাপ খায় না কলকাতার সঙ্গে। অথচ এই বাগানের বললে ভুল হবে প্রায় সমগ্র কলকাতার অন্যতম আকর্ষণ এই বার্মিজ প্যাগোডাটি।

বাগানের উত্তরাংশে এক উপদ্বীপের মাঝে দাঁড়িয়ে এই প্যাগোডা। প্রায় তিনদিকে জল দিয়ে ঘেরা সেই উপদ্বীপ। ১৮৫২ সালে বার্মার প্রোম নামক জায়গায় তৈরি এই সুসজ্জিত প্যাগোডা। প্রোমের গভর্নর মাউং হনন এর বিধবা স্ত্রীর উদ্যোগে তৈরি এই প্যাগোডা গড়ে উঠতে সময় নেয় তিন মাস। সমস্ত কাঠের কাজ মিলিয়ে খরচা হয় ১৫০০ টাকার মতো।



১৮৫৩ সালে লর্ড ডালহৌসি প্রোম নগরী ঘুরতে যান। ব্রিটিশদের দখলে তখন প্রোম। ডালহৌসির ভীষণভাবে পছন্দ হয় এই প্যাগোডা এবং তিনি সিদ্ধান্ত নেন এটিকে কলকাতায় সরিয়ে আনার। এরপরই খুলে ফেলা হয় এই প্যাগোডা এবং ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির জাহাজ ‘সোয়ে গং’-এ করে হুগলিতে এসে পৌঁছায় সেপ্টেম্বরের ২৯ তারিখ, ১৮৫৪ সালে।


প্রাথমিকভাবে ফোর্ট উইলিয়ামের ভিতর জায়গা পেলেও পরে সরিয়ে আনা হয় ইডেন গার্ডেনে। ১৮৫৬ সালে ইডেন গার্ডেনে বারো জন বার্মিজ শিল্পী তিনমাস ধরে জুড়ে দাঁড় করান এই প্যাগোডাকে। এবং সাকুল্যে খরচা হয় ৬০০০ টাকা।

প্যাগোডাটিকে এখনও গেলে যেকোনওদিন দেখতে পাওয়া যাবে বাগানেই। প্রায় দেড়শো বছরের পুরোনো এই প্যাগোডা ভারতের সংস্কৃতির মিলেমিশে থাকার প্রতিনিধিত্ব করে চলেছে যুগ যুগ ধরে।
পার্কটি প্রতিদিন ই খোলা থাকে সকাল ১২:৩০ থেকে বিকেল ৫ টা অব্দি।

লেখক--Akash Ganguly
ছবি--১৬/১২/২০২০

Anujit Dasgupta

Thursday, April 4, 2019

বেলপাহাড়ী - পুরুলিয়া ভ্রমণ - Belpahari - Purulia Tour

 শীতের ছুটিতে বেড়াতে যাবার প্ল্যান করছেন?? তাহলে ঘুরে আসুন বেলপাহাড়ী থেকে। পাহাড়, জঙ্গল, নদী, ঝর্ণা সব মিলিয়ে দারুণ একটা জায়গা।

কলকাতা থেকে বেলপাহাড়ীর দূরত্ব 218 কিমি , বাইক/কার নিয়ে গেলে সময় লাগবে প্রায় 5 ঘন্টা (কলকাতা > কোলাঘাট > পাঁশকুড়া >চৌরঙ্গী > পরিহাটি > বেলপাহাড়ী)

দেখার জায়গা :
1. Dhangikusum : পশ্চিমবঙ্গের একদম পশ্চিমে একটি ছোট্ট গ্রাম, যার বেশির ভাগ লোকই পাথর শিল্পী। এখানে জঙ্গলের মাঝে রয়েছে পাহাড়ি ঝর্ণা যা হুদহুদি জলপ্রপাত নামে পরিচিত। বেলপাহাড়ী থেকে দূরত্ব 15 কিমি।
2. Ketki Jharna: সিঙ্গাডুবা গ্রামের কাছে জঙ্গল আর পাহাড় ঘেরা এক বিশাল জলাধার। পাহাড় থেকে বৃষ্টির জল নেমে এরকম জলাধার তৈরি হয়েছে। বেলপাহাড়ী থেকে এর দূরত্ব 15 কিমি।



3. Gajpathar : এটিও একটি সুবিশাল প্রাকৃতিক জলাধার। এর জলের মাঝ বরাবর দূরে মেঘ পাহাড় দেখা যায়। লাল আকাশ, নীল জলে পাহাড়ের প্রতিবিম্ব, সব মিলিয়ে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্তের সময় এক অদ্ভুত মায়াবী পরিবেশ তৈরি হয় এখানে। বেলপাহাড়ী থেকে এর দূরত্ব 8 কিমি।



4. Gadrashini Hill and Cave : প্রায় 300 মিটার উচু সবুজে ঘেরা এই পাহাড়, যার ওপরে রয়েছে অনেক পুরোনো পাহাড়ি গুহা আর বাসুদেব ও শিবের মন্দির। বেলপাহাড়ী থেকে এর দূরত্ব 9 কিমি।
5. Khandarani Lake : তিনটি পাহাড়ে ঘেরা মনমুগ্ধকর এই হৃদ। শীতকালে পরিযায়ী পাখিরা এর নীল জলের কাছে ভিড় করে। বেলপাহাড়ী থেকে এর দূরত্ব 8.6 কিমি।


6. Ghagra waterfall : তারাফেনী নদীর জল পাথুরে এলাকার মাঝে গিয়ে তৈরি হয়েছে এই জলপ্রপাত। পাথরের মধ্যে গোল গোল প্রাকৃতিক গর্তে কলসির মত জল জমা থাকে তাই গাগরা থেকে এই জায়গার নাম হয়েছে ঘাঘরা। বেলপাহাড়ী থেকে এর দূরত্ব 6 কিমি।
Ghagra waterfall


এছাড়া ও বেলপাহাড়ীতে আরো অনেক দেখার জায়গা (যেমন লালজল পাহাড়, তারাফেনী ড্যাম, বোদাডিহি গুহা, চাতন ডুংরি ইত্যাদি) আছে। বেশ কিছু এমন জায়গা ও আছে যেগুলি এখনও অনাবিষ্কৃত।
ভিডিও টি দেখতে পারেন : https://youtu.be/teaSnpkIYPE

Rkp Raj

Sunday, March 24, 2019

বালাসোর (বালেশ্বর) ও চাঁদিপুর - Balasore or Baleshwar and Chandipur

 এক লম্বা ড্রাইভে উড়িষ্যার বালেশ্বর ও চাঁদিপুরে:-

সেদিন হঠাৎ বসেছিলাম উড়িষ্যার ম্যাপ নিয়ে। ম্যাপ বলতে গুগলের ম্যাপ। আজকাল কোথাও যাবার কথা ভাবলেই প্রথমেই খুলে বসি, "গুগল ম্যাপ"। সেদিন ম্যাপে দেখতে বসেছিলাম, উড়িষ্যার বালাসোরের (বালেশ্বর) ও চাঁদিপুরের লোকেশন এবং যাবার রাস্তার যাবতীয় তথ্য। ইচ্ছে ছিল একটা লং ড্রাইভে যাওয়ার। কিন্তু শুধুমাত্র যাবার ইচ্ছে থাকলেই তো হয়না; কোথাও যাবার আগে সেই জায়গা এবং তার আশেপাশের দর্শনীয় জায়গাগুলোর আদ্যপান্ত জানার দরকার।
Sea beach, Chandipur
                                                        Sea beach, Chandipur

অবশ্য এই স্বভাব, আমার বহুবছরের, বোধহয় পেশাদারিত্বের তাগিদে। সেদিন চাঁদিপুর এবং তার আশেপাশের দর্শনীয় স্থানগুলোর বিস্তারিত বিবরণ দেখার পর, চাঁদিপুর সমুদ্র সৈকতের উপর, উড়িষ্যা ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের পান্থনিবাসে থাকাই মনস্থ করলাম। একেইতো চাঁদিপুরে সবচেয়ে ভালো লোকেশনে ওই পান্থনিবাস। তার উপরে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য ভাড়ায় একটা ছাড় রয়েছে। এছাড়াও রয়েছে কম্প্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্ট। অবশ্য কম্প্লিমেন্টারি ব্রেকফাস্টের চল, আজকাল ভারতের সমস্ত বাজেট এবং স্টার হোটেলগুলোতে চালু হয়েছে। অতএব একদিন ইন্টারনেটে উড়িষ্যা ট্যুরিজম ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের ওয়েবসাইট থেকে পান্থনিবাসের একটা ঘরের বুকিং করে ফেললাম।

Concrete area of Panthanivas on the sea beach, Chandipur.
                                  Concrete area of Panthanivas on the sea beach, Chandipur

------ ২ ------
গত বছরের আঠেরোই জানুয়ারির (১৮-০১-২০১৯) সকালে, গাড়ি নিয়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম উড়িষ্যার চাঁদিপুরের উদ্দেশ্যে। দক্ষিণেশ্বরের নিবেদিতা সেতুর টোলগেট পার করে উঠেছিলাম ষোলো নম্বর জাতীয় সড়কে। কোলাঘাট, ডেবরা পার হয়ে খড়গপুর চৌরঙ্গীমোড় থেকে তিন কিলোমিটার আগে, বাঁহাতে বাঁক নিয়েছে এন.এইচ.১৬। আবার ওই মোড় থেকে শুরু হয়েছে এন.এইচ ৪৯ যে রাস্তা ওখান থেকে শুরু হয়ে, লোধাশুলী, বাহারাগরা হয়ে কেওনঝড়ে গিয়েছে। এন.এইচ.১৬ ওই মোড় থেকে ডেবরা, দাঁতনের উপর দিয়ে, সোজা উড়িষ্যার জলেশ্বর পার হয়ে বালেশ্বরের উপর দিয়ে চলে গিয়েছে ভুবনেশ্বরের দিকে। একেবারে ঝাঁ-চকচকে রাস্তা। ট্রাফিক নেই বললেই চলে। এককথায় ড্রাইভিং করার স্বর্গ। আমি জলেশ্বরের টোলগেট পার হয়ে, সুবর্ণরেখা নদীর উপরের ব্রিজ পার করে এগিয়ে গেলাম বালেশ্বরের দিকে। বালেশ্বর শহরে ঢোকার চৌমাথার আগেই, রেলওয়ে ওভারব্রিজ পার হওয়ার পর, বাঁহাতে এগিয়ে চলেছে চাঁদিপুর যাবার রাস্তা। হাইওয়ে থেকে নীচে নেমে গেলাম, সার্ভিস রোড দিয়ে। ওটাই সবচেয়ে শর্টকাট রাস্তা, কলকাতা থেকে চাঁদিপুর যাবার জন্য। একটু এগোতেই পড়লো ইতিহাস প্রসিদ্ধ বুড়িবালাম নদীর সেতু। রাস্তা দেখলাম কখনও চলেছে বুড়িবালামের পাশাপাশি হাত ধরাধরি করে, আবার কখনও টা- টা-বাই-বাই জানিয়ে অনেক দুরে। আমি বালেশ্বর শহরের অনেক আগে থেকেই চাঁদিপুর যাবার রাস্তা ধরেছিলাম। বালেশ্বর শহর থেকে প্রায় পনেরো কিলোমিটার দূরে চাঁদিপুর। লোকালয় ছাড়িয়ে কিছুটা চলার পর, রাস্তার দুধারে শুরু হলো অনুর্বর রুক্ষ জমি। তার মধ্যেই লাগানো হয়েছে নারকেল, খেজুর এবং কলাগাছ। তবে কিছু কিছু জায়গায় রাস্তার ধারে ইতস্তত করছিল কৃষ্ণচূড়া আর রাধাচূড়া গাছ । চাঁদিপুর সমুদ্র সৈকতে পৌঁছনোর বেশ কিছু আগেই শুরু হলো, রাস্তার ধারে পাঁচিলে ঘেরা কমপাউন্ড, শেষ আর হয়না। বুঝলাম ওটাই হলো চাঁদিপুরে অবস্থিত ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা ও উন্নয়ন সংগঠনের ( Defence Research and Development Organisation) কমপাউন্ড। অবশ্য ভারতের সমস্ত ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা করা হয় আব্দুল কালাম দ্বীপ থেকে। দ্বীপটি চাঁদিপুর সমুদ্র উপকূল থেকে ১০ কিলোমিটার দূরে বঙ্গোপসাগরে অবস্থিত।
The bank of Buribalam river.
                                                        The bank of Buribalam river

পান্থনিবাসে যাবার পথে বেশ কয়েকটি হোটেল দেখলাম সমুদ্র সৈকতের কাছেই; পাশাপাশি। দেখতে দেখতে পৌঁছলাম আমাদের গন্তব্যস্থল চাঁদিপুরের পান্থনিবাসে । দক্ষিণেশ্বরের নিবেদিতা সেতু থেকে ২৬১ কিলোমিটার। আমার বাড়ি থেকে ঠিক ২৬৪ কিলোমিটার। সকাল সাতটায় বেরিয়েছিলাম। পৌঁছাতে পৌঁছাতে ঘড়িতে বাজল দুপুর একটা‌। অবশ্য রাস্তায় বেশ কয়েকটি জায়গায় দাঁড়িয়ে ছিলাম, চা, জলখাবারের জন্যে। পান্থনিবাসে পৌঁছে দেখলাম, কমপাউন্ডের চারিদিকে উচুঁ পাঁচিলে ঘেরা। প্রথমেই ঢোকার গেট। গেটের ভেতরে গাড়ি ঢোকানোর আগে, রিজার্ভেশনের কাগজ দেখতে চাইল। ভালই লাগল সুরক্ষার ব্যবস্থাপনা দেখে। এতটা ড্রাইভ করে আসার পর, পেটের ভিতরে ছুঁচোর ডন মারা শুরু হয়ে গিয়েছিল। রিসেপশনের ফর্ম্যালিটি মিটিয়ে, ওখানেই লাঞ্চের অর্ডার দিয়ে, আমাদের জন্য নির্দিষ্ট ঘরটি দখল করলাম; তারপর সোজা হোটেলের ডাইনিং হলে। হলটা বেশ বড়। একসঙ্গে তিরিশ চল্লিশজন লোকের খাবার খাওয়ানোর ব্যবস্থাপনা রয়েছে।
Nilgiri Palace
                                                                      Nilgiri Palace

------------ ৩ ----------
মধ্যাহ্ন ভোজন পর্ব শেষ করে, পান্থনিবাসের ভেতরে এক রাউন্ড চক্কর মারলাম দুজনে। বিশাল কমপাউন্ড; কিন্তু বাইরে থেকে বোঝাই যায়না। হোটেলের আকৃতিটা অদ্ভুত রকমের গোলাকার। আমি আমার জীবনে বিভিন্ন হোটেলে থেকেছি, কিন্তু এরকম গোল হোটেল আমি এর আগে কখনও দেখিনি । আমাদের ঘরটা দেখলাম সামনের দিকে। ঘর থেকেই সমুদ্র সৈকত দেখা যাচ্ছিল। ভেতরে আর একটা গোলাকৃতি কমপ্লেক্স। সেই কমপ্লেক্সের সামনে হোটেলের একটা বেশ বড় মাঠ আছে, যেখানে দোলনা, স্লিপ ইত্যাদি আছে। এমনকি ব্যাডমিন্টন খেলার কোর্ট। এছাড়া কিছু ফুলের গাছও আছে । নানান রকমের পাখি রয়েছে খাচায়। সবমিলিয়ে একটা শান্ত নিরিবিলি আর পরিচ্ছন্ন ভাব; যেটা একটা জায়গাকে ভাল লাগার জন্য যথেষ্ট উপযোগী। সবথেকে আকর্ষণীয় ব্যাপার হল সমুদ্রের নৈকট্য । ওই অংশে সমুদ্র সৈকতটা(sea beach) এবং ওখানকার বসার জায়গা ইত্যাদি, পান্থনিবাসের নিজস্ব, ওখানে বাইরের কাউকে ঢুকতে দেওয়া হয় না ।
Durga Mandir, Adjacent to Nilgiri Palace
                                            Durga Mandir, Adjacent to Nilgiri Palace

হোটেল কমপাউন্ডের পরেই শুরু হয়েছে সৈকত। হোটেলের রিসেপশনের সামনে লনে নিজস্ব বাগান আর একটা ছোট্ট জলাশয় আছে, সেখানে আবার কচ্ছপ রয়েছে। সমস্ত দেখার পর, একটু বিশ্রাম নিয়ে গেলাম সমুদ্রের ধারে। কিন্তু কোথায় সমুদ্র ? দিগন্তরেখা পর্যন্ত যতদূর চোখ যায় শুধু বালি আর বালি ! সেই বালি কিন্তু নরম বালি নয়, শক্ত ভিজে বালি । হ্যাঁ, এটাই চাঁদিপুরের প্রধান আকর্ষণ । এখানে ভাঁটার সময়ে সমুদ্র, তীর থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে চলে যায় । সমুদ্রতীর থেকে জলের রেখা দেখাও যায় না । জোয়ার ভাঁটার মধ্যে এই বিশাল পার্থক্যটা সারা ভারতবর্ষে একমাত্র গুজরাটের ভাবনগরের কলিয়াক সমুদ্র সৈকত ছাড়া আর কোথাও আছে বলে আমার জানা নেই। ঘড়িতে দেখলাম বিকেল চারটে বেজেছে, সূর্য ক্রমশঃ দিগন্তের দিকে ঢলে পড়ছে, এর পরে আর বিচে হাঁটা যাবে না, তাই আমি জলের দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। গিন্নি বেঞ্চের উপর বসে রইল।

Nilgiri Palace and Nilgiri Hill
                                                    Nilgiri Palace and Nilgiri Hill

কিন্তু পাঁচ কিলোমিটার শক্ত বালির ওপর হেঁটে চলা সহজ নয়, আর মাঝে মাঝে গোড়ালি ডোবানো জমা জল, কাজটাকে আরও কঠিন করে দেয়। প্রায় এক-দেড় কিলোমিটারের মতো এগিয়ে ফিরে এলাম । হোটেলের পাশেই সমুদ্রের সৈকত ধরে রয়েছে ঝাউবন; ওদিকে এগিয়ে গিয়ে দেখলাম, ঝাউ বনে হাওয়া ঢুকে খেলা করছে। সিমেন্টে বাঁধানো রাস্তার ঠিক নীচেই রয়েছে বালি। কয়েকটি কুচো বাচ্চা বালিতে নাম লিখছে, কিন্তু ঢেউ এসে মুছিয়ে দিচ্ছে না, অন্যান্য সমুদ্র সৈকতের মতো; কারন জল বা ঢেউ নেই ওখানে। একটু এগিয়েই বোল্ডার। চাঁদিপুরের সৈকতে খালি পায়ে হাঁটা যায় না। গোটা সৈকত জুড়েই ছড়িয়ে রয়েছে গুঁড়ো গুঁড়ো শামুক, ঝিনুক। মৃত রাজকাঁকড়ার খোলসও ছড়িয়ে রয়েছে ইতিউতি। আসলে এখনও মানুষ এসব জায়গায় পা রাখেনি তেমন। তাই ঝিনুক কুড়ানো যায় প্রাণ ভরে। হাঁটলেই পায়ের নীচে মড়মড় শব্দ তুলে গুঁড়িয়ে যায় ঝিনুক।

Foothill of Nilgiri( Pancha lingeswar)
                                                   Foothill of Nilgiri( Pancha lingeswar)

--------- ৪ ------------
সমুদ্রের তীরেই ঘোরাঘুরি করছিলাম দুজনে। কখনো পায়চারি, আবার কখনো একটু বসে জিরিয়ে নেওয়া। পান্থনিবাস একেবারে সমুদ্রের ধারেই। পান্থনিবাসের ঠিক সামনেই সমুদ্রের বিচের উপরে অনেকখানা জায়গা জুড়ে সাজানো রয়েছে বসার বেঞ্চ, কারুকাজ করা আলোকস্তম্ভ। লাইন দিয়ে রয়েছে হস্তশিল্পের দোকান, বিক্রি হচ্ছে চাউমিন এবং এগরোল। কিন্তু বাঁধানো বসার জায়গায় যা আলো আছে, তা সৈকতে পৌঁছায় না। অন্ধকার সমুদ্র, অনেক অনেক দূরে জেলেদের নৌকার টিমটিমে আলো। সমুদ্র এখানে গুটি গুটি পায়ে বেলাভূমিতে ফেনার নূপুর পরিয়ে যায়। একাই পায়চারি করছিলাম এদিক ওদিক। হটাৎ দেখি, গিন্নি সৈকতে নেমে বালির উপর ঝিনুকের খোঁজে ব্যস্ত। দেখে ভাবলাম, "ওই সাগরবেলায় ঝিনুক খোঁজার ছলে, আরও একবার নিজের শৈশবে হারিয়ে যাওয়ার ঠিকানা বোধহয় ওড়িশার চাঁদিপুর"।
Jagannath temple at Ispat colony, Balgopalpur, Balasore.
                                    Jagannath temple at Ispat colony, Balgopalpur, Balasore.

আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখলাম, সূর্য অস্তাচলে যাবার জন্য তোড়জোড় শুরু করেছে। হটাৎ দেখি, ভীড় বাড়তে শুরু করেছে। বাইরের দিক থেকে পান্থনিবাসে ঢোকার প্রধান ফটকের পাশের ছোট্ট গেটটা দিয়ে, বাইরের লোক এসে, সমুদ্রের তীরে ভীড় জমিয়ে ফেলেছে। শুনলাম, বিকেল পাঁচটা থেকে জোয়ার শুরু হয়েছে। সন্ধ্যের পরেই সমুদ্রের জল তীর পর্যন্ত এসে যাবে। তাই এত ভীড়। অনেকেই সৈকতে নেমে জলের দিকে এগিয়ে চলেছে দেখলাম। আমিও হাঁটা শুরু করলাম ওদের পেছন পেছন। সত্যিই তাই। মাত্র দুশো মিটারও যেতে হলোনা, আধো অন্ধকারে দেখলাম সমুদ্রের ঢেউ আছড়ে পড়ছে বেলাভূমিতে। দেখতে দেখতে চারিদিকে অন্ধকারের ঘনঘটা শুরু হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন একটু দুরুদুরু করা শুরু হয়েছিল, এই ভেবে যে সমুদ্রের জল যে কোনো মূহুর্তে আছড়ে পড়বে আমার উপর। আর দাঁড়িয়ে থাকলাম না, ঢেউয়ের আছড়ে পড়ার ওই দৃশ্য ক্যামেরা বন্দি করে দ্রুতগতিতে পা চালিয়ে দিলাম তীরের দিকে। রাতে ডিনারের পর আবার গিয়ে বসেছিলাম বীচের উপরে বেঞ্চের উপর কিছুক্ষণের জন্য। টিমটিমে আলো আর অন্ধকারে কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। কিন্তু ঢেউয়ের আওয়াজে বুঝতে পারলাম, সমুদ্রের জল তীরের কাছাকাছি এসে পৌঁছিয়েছে।
----------৫ -----------
পরদিন সকালে সূর্যোদয় দেখার সাথেই, সমুদ্রের সঙ্গে নিবিড় সখ্যতা তৈরি হয়ে গেল। তীরে জল ছিল না। কিন্তু সমস্ত রাত ধরে খেলা করে যাওয়া, জলের ঢেউয়ের ছাপ এবং জায়গায় জায়গায় জমে থাকা জল দেখে, বুঝতে কোনও অসুবিধা হলোনা, রাতে জলের উপস্থিতি উপলব্ধি করতে। সকালে ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে পরলাম চাঁদিপুরের আশেপাশে।চাঁদিপুর থেকে ঘণ্টাখানেকের দূরত্বেই বেশ কিছু ঘোরার জায়গা আছে। আমাদের প্রথম গন্তব্য ছিল বুড়িবালাম। পান্থনিবাস থেকে মাত্র দুই কিমি দূরে বুড়িবালাম নদীর তীর। স্থানীয় মানুষেরা চষাখণ্ড বলে থাকেন। ওখানেই বুড়িবালাম মিশেছে বঙ্গোপসাগরে। ওইখানে অগ্নিযুগের বীর বিপ্লবী বাঘাযতীন, অস্ত্রবোঝাই মেভারিক জাহাজ ধরা পড়বার পরেও, চার্লস টেগার্টের ব্রিটিশ বাহিনীর সঙ্গে এক অসম লড়াইয়ে প্রাণ হারিয়ে, লুটিয়ে পড়েন এই বুড়িবালামের তীরে। কিন্তু ঠিক কোথায় ওই লড়াই হয়েছিল, তার সঠিক সন্ধান কেউ দিতে পারলো না। ওইখানে নদীর জেটিতে পরপর দাঁড়িয়ে ছিল, মাছ ধরার ট্রলার। পাশেই মাছের পাইকারি বাজার। শুনলাম উড়িষ্যা সরকার বিপ্লবী বাঘাযতীনের স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে, বুড়িবালামের তীরে একটি পার্ক তৈরি করে, বাঘাযতীনের মূর্তি স্থাপন করেছে। মনটা একটু ভারাক্রান্ত হয়ে গেল, অগ্নিযুগের বিপ্লবীদের কথা ভেবে।
---------- ৬ --------
বুড়িবালামের তীরে কিছুক্ষণ কাটিয়ে দুজনে রওয়ানা দিলাম নীলগিরি রাজবাড়ির দিকে। বালেশ্বর শহরের উপর দিয়ে, রেলওয়ে লেভেল ক্রসিং পার করে সোজা উঠলাম ষোলো নম্বর জাতীয় সড়কে। ওই সড়ক ধরে, ভুবনেশ্বরের দিকে কিছুটা যাবার পর শুরু হয় সিমলিপাল ফরেস্টে যাবার রাস্তা। উনিশ নম্বর রাজ্য সড়ক। রাস্তার একদিকে পাহাড়। ওই পাহাড়ের গায়েই নীলগিরি প্রাসাদ। চাদিপুরের পান্থনিবাস থেকে দুরত্ব তেত্রিশ কিলোমিটার। নীলগিরি আসলে ব্রিটিশ আমলের প্রিন্সলে স্টেট। ১১২৫ সালে ছোটনাগপুরের কোনও এক রাজা এসে এখানে ভিত্তিস্থাপন করেন। রাজপুত ঘরানার লোকই ছিল এখানের বাসিন্দা। স্বাধীনতা সংগ্রামীরা এই প্রিন্সলে স্টেটটিকে রাজাদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়। পরে ভারত স্বাধীন হলে নীলগিরি আলাদা শহর রূপে গড়ে ওঠে। এখন ভাঙাচোরা এককালের রাজপ্রাসাদ। জীর্ণ সিংহদুয়ার। দেওয়ালে রাজপুতানা চিত্রশিল্পের ভগ্নাবশেষ দেখে বোঝা যায়, এককালে দাপটে চলত রাজত্ব। একটা অংশে যত্নআত্তি করে রঙ করা। তাতে লেখা ‘নিজাগড় প্যালেস'। প্যালেসের কিছুটা অংশ মেরামত করে এখনকার রাজা থাকেন। আর কিছুটা ভাগে রয়েছে একটি স্কুল। প্যালেসের পাশেই একটি দূর্গা মন্দির। রাজবাড়ির পাশেই আছে নীলাগিরি পাহাড়, যেটার একেবারে ওপরে না হলেও অনেকদূর পর্যন্ত ট্রেকিং করে ওঠা যায় ।
---------- ৭ ----------
নিজাগড়(নীলগিরি) প্যালেস থেকে বেরিয়ে গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে এগিয়ে গেলাম, আট কিলোমিটার দূরের পঞ্চলিঙ্গেশ্বর মন্দিরের দিকে। নীলগিরি পাহাড়ের উপরের পঞ্চলিঙ্গেশ্বর মন্দির বোধহয় চাঁদিপুর/বালাসোরের অন্যতম আকর্ষণীয় ঘোরার জায়গা। নীলগিরি পাহাড় মন্দিরটিকে চারিদিক দিয়ে আচ্ছাদিত করে রেখেছে। তিনশো পাঁচটি সিঁড়ি পেরিয়ে পাহাড়ের উপরে, ভগবান শিবের পাঁচটি শিবলিঙ্গে জন্য পঞ্চলিঙ্গেশ্বর জনপ্রিয়। সবচেয়ে আকর্ষণীয় হলো, শিবের লিঙ্গের পাশেই প্রবহমন ঝর্ণার উপস্থিতি। যদিও তিনশো পাঁচটি সিঁড়ি পেরিয়ে পঞ্চলিঙ্গেশ্বরে পৌঁছাতে হয় কিন্তু বাস্তবিক ক্ষেত্রে দেখলাম, সিঁড়িগুলো দিয়ে উপরে উঠতে খুব বেশী কষ্ট হয় না। মন্দির বলতে অনেকটা পাহাড়ের গায়ে গুহার মতো। প্রচুর আলতা সিঁদুর লাগানো দেওয়াল, মাথায় ধর্মীয় পতাকা উড়ছে। পাঁচটা শিবলিঙ্গ রয়েছে জলের ধারার ঠিক পাশেই। ভক্তরা জলের ধারার জল মাথায় ছিটিয়ে পুজোয় বসছে। অবশ্য প্রতিটি শিবলিঙ্গের সামনে পুরোহিত রয়েছে, যারা পূজা করার জন্য সাহায্য করছে। সবচেয়ে যেটা ভালো লাগলো, তা হলো, ওঠার সিড়িগুলোর ধাপের সঙ্গেই বসার ব্যবস্থা, ফলে ওঠার ফাঁকে প্রয়োজনে একটু জিরিয়ে নেওয়া যেতে পারে। আমরা দুজন গল্প করতে করতে এবং প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে দেখতে উপরে উঠছিলাম। কিছু কিছু জায়গায় চারিদিকের নৈসর্গিক দৃশ্য দেখে চোখ জুড়িয়ে যাচ্ছিল ।
-------- ৮ --------
পঞ্চলিঙ্গেশ্বর দেখার পর আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিল রেমুনা।
পঞ্চলিঙ্গেশ্বর থেকে দুরত্ব ঠিক তিরিশ কিলোমিটার। কিন্তু অনেক বেলা হয়ে গিয়েছিল, পাহাড়ের উপর থেকে নীচে নামতে। ফলে লাঞ্চ করার জন্য একটা ভালো রেস্টুরেন্ট খুঁজে বের করতে অনেকটুকু সময় পার হয়ে গেল। যাইহোক শেষপর্যন্ত একটা রেস্টুরেন্টে ঢুকে মুখের ভিতর খাবার ঢুকিয়ে রেমুনার উদ্দেশ্যে এগিয়ে গেলাম।
রেমুনায় বিখ্যাত "ক্ষীর চোরা গোপীনাথ" । কথিত আছে, চৈতন্য মহাপ্রভু এবং মাধবেন্দ্র পুরী, পুরীতে যাবার সময় রেমুনাতে বিশ্রাম নিয়ে পুরী যাত্রা করেন। নানান জনশ্রুতি রয়েছে চৈতন্য মহাপ্রভু এবং মাধবেন্দ্র পুরী এবং ক্ষীর চোরা গোপীনাথকে নিয়ে। বৈষ্ণব পদাবলী চৈতন্যদেব সম্পর্কে বলেছে, "রেমুণা তে গোপীনাথ পরমমোহন। ভক্তি করি কৈলা প্রভূ তাঁর দর্শন"। মন্দিরের গর্ভগৃহে রত্ন সিংহাসনে বসানো রয়েছে তিনটি কলেবর। মাঝখানে আছেন ক্ষীরচোরা গোপীনাথ, গোপীনাথের বাঁদিকে গোবিন্দ আর ডানদিকে মদনমোহন। শুনলাম মন্দিরে ভোরে মঙ্গলারতি থেকে রাত্রে বিশ্রাম অবধি ৮ বার আরতি হয়। বিখ্যাত ক্ষীরভোগ যাকে ‘অমৃতকেলি’ বলা হয় তা সন্ধ্যাবেলায় নিবেদন করা হয়। গোপীনাথ কে সপ্তাহে সাতদিনে সাত রঙের পোষাক পরানো হয়। দুপুরে নিবেদন করা হয় অন্নভোগ। ওই মন্দিরে শ্রী চৈতন্যদেবের পায়ের ছাপ রাখা আছে । ওখানকার সবথেকে বড় আকর্ষণ দেখলাম, সেটা হলো অত্যন্ত উৎকৃষ্ট মানের ক্ষীর। মন্দিরের ভেতরেই বিক্রি হচ্ছে; দামেও সস্তা। ২০ টাকা, ৩০ টাকা আর ৫০ টাকা। কিছু কিনে নেওয়া হলো, বাড়িতে নিয়ে আসার জন্য। মন্দির কমপ্লেক্সের ভিতরে নাটমন্দিরকে কেন্দ্র করে, দেওয়ালে খোদিত আছে কৃষ্ণ লীলার নানা ভার্স্কয্য। পুকুর পাড়ে রয়েছে এক আর্শ্চয্য অশ্বত্থ গাছ, যার পাতাগুলি অনেকটা ঠোঙার মত মোড়া। মাধবেন্দ্রপুরীর মঠ ও সমাধি দেখলাম রাস্তার পাশে। এখানেও একটা জগন্নাথের মন্দির দেখলাম ।
---------- ৯ ---------
রেমুনা থেকে সোজা এগিয়ে গেলাম বালগোপালপুরের জগন্নাথ মন্দিরের দিকে। রেমুনা থেকে দুরত্ব সাত কিলোমিটার। বালেশ্বরের বালগোপালপুরের এই মন্দিরটির কথা অনেকদিন ধরেই শুনেছিলাম। ইমামি গ্রুপ দ্বারা নির্মিত ও পরিচালিত এই মন্দিরটি পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের অবিকল প্রতিরুপ বলে দাবি করা হয়। তাই ওই মন্দিরটি দেখার ইচ্ছে ছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। যদিও মন্দিরটি বেশি দিনের নয়। ২০০৯ সালে মন্দির নির্মাণের কাজ শুরু হয় এবং ২০১৫ সালে নভেম্বর মাসে মন্দিরটির উদ্বোধন হয়।
মন্দিরটা দেখার পর মনে হলো, এককথায় বলতে গেলে অপূর্ব। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের সঙ্গে তুলনা করার মতো ধৃষ্টতা আমার নেই। কিন্তু মন্দিরটি দেখার পর এর স্থাপত্যর প্রশংসা না করে থাকা যায় না। ১১.৭ মিটার উঁচু ওই মন্দিরে ষোলটি কোনারক চক্র আছে। দেখেই বুঝতে পারলাম খুব ভালভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। মন্দিরটির ছাদে ও দেয়ালে শ্রীকৃষ্ণের বাল্য লীলা, বিষ্ণুর দশাবতার এবং পুরাণের অনেক কিছু নিয়ে পট্টচিত্র আঁকা আছে। পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের মতোই এখানেও ভোগের ব্যবস্থাপনা রয়েছে। সকালে ও সন্ধ্যায় আরতি হয়। মন্দিরটা দেখার পর ভাবলাম ওই মন্দিরটা না দেখলে, আমার চাঁদিপুর এবং বালেশ্বর ভ্রমণ অসম্পূর্ণ থেকে যেতো। ওখানথেকেই সোজা পান্থনিবাস এলাম। ঠিক আঠাশ কিলোমিটারের ড্রাইভ। সন্ধ্যাবেলায় আবার গিয়ে বসলাম, সমুদ্র সৈকতে। পরেরদিন সকালে বেরিয়ে পড়লাম ফেরারপথে; তারসঙ্গে আবার একটা লম্বা ড্রাইভ।
***** আপনারাও ঘুরে আসুন। খুব ভালো লাগবে। নিজের গাড়ি না থাকলে, গাড়ি ভাড়া নিয়ে যেতে পারেন। অথবা ট্রেনে যেতে পারেন। অনেক ট্রেন আছে হাওড়া থেকে; কয়েকটির নাম দিলাম। ১) ফলকনামা এক্সপ্রেস। ২) ইস্ট কোস্ট এক্সপ্রেস। ৩) করমণ্ডল এক্সপ্রেস।৪) পুরী এক্সপ্রেস। ৫) জনশতাব্দীএক্সপ্রেস। ৬) ধৌলি এক্সপ্রেস। বালেশ্বর থেকে চাঁদিপুরের দূরত্ব ১৬ কিমি। বালাসোর স্টেশন থেকে গাড়ি ভাড়া করে চলে যেতে পারেন চাঁদিপুর থেকে, বালেশ্বরের আশেপাশের জায়গাগুলোতে।

Muktagopal Bhattacharyya

Sunday, March 10, 2019

দেউলটি (হাওড়া) - Deulti(Howrah)

 দেউলটিতে কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি ও বর্ষায় রূপনারায়ন নদীর রুপ দেখা ঃ

০৩ - ০৮ - ২০১৮
এক বর্ষার দিনে বেড়িয়ে পড়লাম বর্ষায় রূপনারায়ন নদীর সৌন্দর্য‌্য দেখবো বলে । সকালবেলা হাওড়া থেকে মেচেদা লোকাল ট্রেনে উঠে বসলাম । প্রায় ঘন্টা দুয়েক পর কোলাঘাট ষ্টেশনের আগে দেউলটি ষ্টেশনে নামলাম । ওখান থেকে হেঁটে এবং দুবার অটো পালটে পৌছালাম এক ছোট্ট নিরিবিলি গ্ৰামে। এই গ্ৰামেই ঈশ্বর শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি ।

কথাশিল্পী শরৎচন্দ্রের বাড়ি , দেউলটি
                                     কথাশিল্পী শরৎচন্দ্রের বাড়ি , দেউলটি


স্থানীয় লোকের কাছে খোঁজ নিয়ে বাড়ির কাছে এসে পৌঁছালাম । খুব সুন্দর ভাবে রক্ষনাবেক্ষন করা হয়েছে বাড়িটি । এক কেয়ারটেকার এসে বাহিরের গেট খুলে দিলেন ভিতরে প্রবেশ করার জন্যে । উনি একতলার সব ঘরগুলো বাইরে থেকে দেখিয়ে তাঁর ইতিহাস বর্ণনা করলেন ।
পাশের রাস্তা থেকে দেখা শরৎচন্দ্রের বাড়ি
                                     পাশের রাস্তা থেকে দেখা শরৎচন্দ্রের বাড়ি 

ওনার কাছ থেকে জানলাম শরৎচন্দ্রের এক ভাইপো এখন এই বাড়িটির রক্ষনাবেক্ষন করছেন । বাড়ির পিছনে ধানের গোলা, রন্ধনশালা ইত্যাদি সবই রয়েছে । পাশেই একটি শান বাঁধানো ঘাট সহ পুকুর রয়েছে , যে পুকুরের উল্লেখ ওনার কয়েকটি গল্পে পাওয়া গিয়েছে । ওনার বাড়ি থেকে দূরেই দেখা যাচ্ছে রূপনারায়ন নদী । যে নদী একসময় এই বাড়ির পাশ দিয়ে বয়ে যেত আজ তা ভাঙনের কারণে দূরে সরে গিয়েছে । পুকুর ঘাটে কিছুক্ষণ বসে তারপর গ্ৰামের পথ দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম রূপনারায়ন নদীর পাড়ের উদ্দেশ্যে । গ্ৰামের মধ্যে কিছুটা ঢুকে তারপর ক্ষেত্রের আল দিয়ে হাঁটা শুরু । কাদা এবং পিছলা পথ এঁকে বেঁকে কিছুটা পার হয়ে অবশেষে নদীর পাড়ে এসে পৌছালাম ।
বর্ষার রূপনারায়ন নদী , দেউলটি
                                                    বর্ষার রূপনারায়ন নদী , দেউলটি 


বর্ষায় জলে ভরাট নদী । মাঝে মধ্যে দু-চারটি নৌকা যাতায়াত করছে , যার অধিকাংশ মাছধরার নৌকা । নদীর পাড়ে ঘাসের উপর বসে ভরা বর্ষার নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করা , সে এক আলাদা অনুভূতি । নদীর পাড় বরাবর স্থানীয় লোকজন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে মাছের মিন (চারা) অর্থাৎ চারা মাছ বা ছোট্ট মাছ ধরছে । জানলাম এই কাজ এখানকার মানুষের একটা বড় জীবিকা । এই কাজ থেকে চার ঘন্টায় গড়ে উপার্জন হয় একশো থেকে দেড়শো টাকা । কিছুক্ষণ পরে মেঘের ঘনঘটা । বৃষ্টি শুরু হল । রূপনারায়ন নদীতে বৃষ্টি , সে এক অপরূপ দৃশ্য । পাড়ে বসে সেরূপ দেখার সৌভাগ্য হলো । সাথে ছাতা থাকায় খুব একটা অসুবিধা হয়নি । বেশ কিছু ক্ষন ওখানে কাটিয়ে, কিছু জীবনিশক্তি সঞ্চয় করে কলকাতায় ফেরার পথ ধরলাম ।


Nikhil Dutta

Wednesday, February 27, 2019

মুকুটমনিপুর(বাঁকুড়া) - Mukutmonipur(Bankura)

 ঝাড়খন্ড সীমান্ত লাগোয়া বাঁকুড়া জেলায় কংসাবতী ও কুমারী নদীর সঙ্গম স্থলে অবস্থিত অতি পরিচিত নাম মুকুট মনি পুর।আপনার ব্যস্তময় জীবনের একঘেয়েমি কাটাতে এখানে হারিয়ে যেতে পারেন দিন দুয়েকের জন্য।

ড্যাম এর একদিকে নীল জল , কোথাও ফুঁড়ে উঠেছে ছোট ছোট টিলা
                                        ড্যাম এর একদিকে নীল জল , কোথাও ফুঁড়ে উঠেছে ছোট ছোট টিলা

ড্যাম : প্রায় 11 কিমি দীর্ঘ এই বাঁধ টিতে গাড়ী বা পায়ে হেঁটে ঘুরে বেড়ান। একদিকে সবুজে মোড়া পাহাড় ও ক্ষেত আরেকদিকে নীল জল আর জল ফুঁড়ে উঠেছে ছোট ছোট টিলা।
সূর্যের সোনালী রঙে এই জলরাশি যখন রেঙ্গে ওঠে তাকিয়ে থাকুন সেদিকে। নৌকা বিহারেও সূর্যাস্তের এই অপরূপ সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারেন।

মুসাফি রানা : বাঁধ লাগোয়া একটি পাহাড়ের উপর এই ভিউ পয়েন্ট টি।সিমেন্টের সিড়ি বেয়ে উপরে উঠতে হবে টিকিট কেটে। মাশরুম আকৃতির শেডে বসে উপভোগ করুন চোখ জুড়ানো প্রাকৃতিক দৃশ্য কে।

পরেশ নাথ মন্দির :
আরও কিছুটা এগোলে এবার বামদিকে পিতৃ পাহাড়ের উপর এই শিব মন্দির । এই উন্মুক্ত মন্দির স্থানীয়দের কাছে অতি পবিত্র স্থান। আবার অনেকে জৈন সংস্কৃতির নিদর্শন হিসেবেও মনে করেন। এখান থেকেও নিচের মোহনা ও দূরের বন পুকুরিয়া এর দারুন ভিউ পাওয়া যায়।


সোনা ঝুরি প্রকৃতি ভ্রমন কেন্দ্র :
এটি মুকুট মনি পুরে অবস্থিত WBFDC এর একটি নেচার রিসোর্ট। মুকুট মনি পুরে থাকবার একটি আদর্শ জায়গা।শাল ও পিয়ালে ছাওয়া একটি পাহাড়ের বিভিন্ন অংশে বনবিভাগের কটেজ গুলি আপনার মন জয় করে নেবে। আর এখানের হিলটপ থেকে ড্যাম ও চারপাশের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করতে পারবেন ।
(বি: দ্র: - শারীরিক অসুবিধে বা বয়স্ক মানুষ থাকলে বুকিং না করা ভালো)এর ডিটেলস রয়েছে আমাদের ভিডিও তে, দেখতে হলে লিংকে ক্লিক করুন

Koushik Mishra